৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

খবরকাগজ
  • তারায় তারায় প্রাণের সাড়া
    বৈজ্ঞানিক


    দুনিয়ায় পৃথিবীই কি একা প্রাণের ঘাঁটি? নাকি আরো এমন অনেক গ্রহ আছে যেখানে প্রাণের স্পন্দন উঠেছে প্রকৃতির খেয়ালে?
    এ নিয়ে বিজ্ঞানিদের কৌতুহলের শেষ নেই। যত দিন যাচ্ছে, বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির এগিয়ে চলার সুবাদে নতুন নতুন যন্ত্রপাতি নিয়ে গভীর থেকে গভীরতর হয়ে চলেছে মহাবিশ্বে আমাদের আত্মীয়দের জন্য অনুসন্ধান।
    এর জন্যে প্রথমেই দরকার অন্য তারাদের কক্ষপথে গ্রহদের অস্তিত্ত্ব খুঁজে বের করা।
    আমরা সবাই জানি তারারা অনেক দূরে দূরে থাকে। তাদের থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে অনেক বছর করে সময় লেগে যায়। অত বড়ো বড়ো তারাগুলোকেই এত দূর থেকে ছোটো ছোটো আলোর টিপের মত দেখায়, কাজেই তাদের চারপাশে ঘোরা, বহুগুণে ছোটো আকারের গ্রহটহদের যে দুরবিনেও দেখা যাবে না সে তো বোঝাই যায়। তাহলে তাদের খোঁজ মেলে কী করে?
    এইখানেই একাধিক পদ্ধতি নেন বিজ্ঞানীরা। তার মধ্যে সবচেয়ে সফল যে পদ্ধতিটা সেটা বেশ আকর্ষণীয়। কোন তারার সামনে দিয়ে তার একটা গ্রহ যখন ঘুরে যায় তখন তার ফলে তারার খানিকটা আলো আড়াল হয়ে যায়। ফলে দূর থেকে দেখলে, যদিও গ্রহটাকে চোখে পড়বে না কিন্তু যন্ত্র ধরতে পারবে, তারার আলোতে কিছুক্ষণের জন্য যেন একটু কম পড়ছে। ঠিক কতটা কমল তারার আলো তার থেকে হিসেব করে বোঝা যায় গ্রহটার আয়তন কত।
    যখন কোন বস্তুর মধ্যে দিয়ে আলো যায় তখন এক এক বস্তু আলোর এক এক রকমের কম্পাংকের উপাদানকে শুষে নেয়। বর্নালি বিশ্লেষণ নামের একটা পরীক্ষা থেকে টের পাওয়া যায় কোন বস্তুর মধ্যে দিয়ে আলোটা এল। যখন তারাটার সামনে দিয়ে গ্রহটা যাচ্ছে তখন তারার খানিক আলো গ্রহটার আবহাওয়ামণ্ডলের মধ্যে দিয়ে আসে। ফলে সে আলোর বর্নালী বিশ্লেষণ করে সেই দূরের পৃথিবীদের আবহাওয়া সম্বন্ধেও জানতে পারেন বিজ্ঞানিরা।
    এছাড়াও, গ্রহটার অভিকর্ষজ টানের ফলে তারার নিজের অক্ষে ঘোরবার গতিপথেও কিছু এদিকসেদিক হয়ে যায়। সেইটে মেপে গ্রহটার ভর টের পাওয়া যায়।
    এইসব পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রতিদিনই নতুন নতুন তারার কক্ষপথে নত্তুন নতুন গ্রহের সন্ধান মিলছে। প্রতি বছর হু হু করে বেড়ে চলেছে নতুন আবিষ্কৃত গ্রহদের সংখ্যা।


    তবে সবই যে শুধু এইভাবে আবিষ্কার হয় তা নয়। তারার থেকে বেশ খানিক দূরে থাকা অতিকায় গ্রহ হলে আর তার বয়েস কম হলে (যখন সে প্রচুর ইনফ্রা রেড তরঙ্গ বিকীরণ করে) সেসব গ্রহকে দুরবিন দিয়ে দেখে তার ছবিও তোলা যায়। এখন অবধি গোটা আঠারো এইরকম গ্রহের ছবি তোলা গেছে। সঙ্গে তেমন একটা ছবি দেয়া গেল। ১২৯ আলোকবর্ষ দূরে পেগাসাস তারামণ্ডলের একটা তিন কোটি বছরের বাচ্চা তারার কক্ষপথে এই গ্রহটার সন্ধান মিলেছে। তার ছবি তুলেছে ক্যালিফোর্নিয়ার পালোমার অবজারভেটরির HALE টেলিস্কোপ।


    প্রথম সৌরজগতের বাইরের গ্রহ আবিষ্কার হয়েছিল ১৯৯২ সালে। সূর্য থেকে এক হাজার আলোকবর্ষ দূরের এক পালসার তারার কক্ষপথে দুটো গ্রহের সন্ধান পাওয়া যায় সে বছর। ১৯৯৪ সালে এই একই তারার কক্ষপথে সন্ধান মেলে তিন নম্বর গ্রহটির।
    এইখানে একটু পালসার তারাদের কথা বলি। এরা , বলতে পারো জোম্বি তারা। মরেও না মরা ভূত যতসব। আসল তারাটার জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে সেটা তো বুম করে ফেটে গিয়ে লালদানব হয়ে যায়। তারপর হয় কি, নিজেরই মাধ্যাকর্ষণের টানে সেটা বেজায় ছোট হতে আরম্ভ করে। তখন এক একটা অবস্থায় তার এক একটা নাম হয়, যমন ধরো শ্বেত বামন, তারপর আরও ছোট আর ঘন হলে তখন তার নাম হয় নিউট্রন তারা। এই নিউট্রন তারাদের অনেকে আবার তাদের দুটো মেরু থেকে ঝলকে ঝলকে রেডিও তরঙ্গ বিকীরণ করতে করতে ঘুরতে থাকে বনবন করে। ঘোরবার সময় নির্দিষ্ট সময় বাদে বাদে যখন তার বিকীরণটা পৃথিবীমুখো হয় তখন আমাদের যন্ত্র তাকে ধরতে পারে। ঠিক যেমন কোন লাইটহাউসের থেকে নির্দিষ্ট সময় বাদে বাদে একটা আলোর ঝলক তোমাকে ছুঁয়ে যায় তেমনি। এইজন্য অনেকে একে মহাকাশের লাইটহাউসও বলেন।


    প্রকৃত জ্যান্ত তারার চারপাশে ঘোরা প্রথম গ্রহের খোঁজ মেলে ১৯৯৫ সালে , ৫১ আলোকবর্ষ দূরের পেগাসাই৫১ নামের তারার চারপাশে। গ্রহটা বেশ গরম। তার তাপমাত্রা ১২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।আয়তনে বৃহস্পতির অর্ধেক।
    এই মুহূর্তে , মানে এই ফেব্রুয়ারি মাস (২০১৫)পর্যন্ত ১৮৮৮টা গ্রহ আবিষ্কার হয়েছে ১১৮৭টা তারার চারপাশে।
    এইসব গ্রহদের মধ্যে কেউ তার তারার খুব কাছে, কেউ বা অনেক দূরে। তাদের অনেকের মধ্যেই জল থাকলেও কোথাও তা আছে বাষ্প অবস্থায়, কোথাও বা জমাট বরফের চেহারায়। কিন্তু প্রাণ তৈরি হতে প্রয়োজন স্বাভাবিক অবস্থায় তরল জল। তার জন্য গ্রহটাকে তার তারার থেকে ঠিক এমন একটা দূরত্বে থাকতে হবে যাতে তার জল স্বাভাবিক অবস্থায় তরল থাকে। কোন তারার থেকে এইরকম দূরত্বের এলাকাটাকে বলে গোল্ডিলক জোন। অংকের হিসেব বলে, শুধু আমাদের ছায়াপথেই এইরকম সূর্যের সঙ্গে তুলনীয় তারাদের গোল্ডিলক এলাকায় পৃথিবীর মত আকারের ৮৮০কোটি গ্রহ রয়েছে। এখনো অবধি তার মধ্যে নিশ্চিতভাবে খুঁজে পাওয়া গেছে গুটি পঞ্চাশেককে। ২০০৯ সাল থেকে এ কাজটায় প্রধান ভূমিকা পালন করে চলেছে নাসার তৈরি মহাকাশ দুরবিন কেপলার।
    তবে এদের সবারই বয়েস কিন্তু মোটামুটি সৌরজগতের আশেপাশে মানে মোটামুটি ৪৬০কোটি থেকে পাঁচশো কোটি বছর। ফলে পৃথিবীর থেকে অনেক পুরোনো অতিপ্রাচীন যুগের গ্যালাকটিক সভ্যতার ব্যাপারে যেসব গল্পগাছা মানুষ করে সে সব মনে করা হত অবাস্তব কল্পনা। কিন্তু কিছুদিন হল কেপলার মিশন একটা গ্রহমণ্ডলের খোঁজ দিয়েছে যাতে এই ধারণাটাও ভেঙে যাবার মুখে। ১১৭ আলোকবর্ষ দূরের এই তারাটা (কেপলার ৪৪৪) তৈরি হয়েছিল এগারোশো কোটি বছরেরও আগে। ব্রহ্মান্ডটা তখনও একেবারে কমবয়েসি ছোকরা।( আমাদের ব্রহ্মান্ডটা তৈরি হয়েছিল ১৩৮০ কোটি বছর আগে।)

     এই

    পাঁচটা গ্রহই পৃথিবীর মতন চেহারার। পাথরের তৈরি। সম্ভবত আবহমন্ডলও আছে। তারা রয়েছে ওই গোল্ডি লক দূরত্বে।
    ভাবো দেখি ওখানে হয়ত রয়েছে কোন অতিপ্রাচীন সভ্যতা। সেখানকার মানুষজনই হয়তো দূর অতীতে কখনো ধুমকেতুর পিঠে করে দিকবিদিকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন প্রাণের বীজ। সেই থেকেই হয়ত পৃথিবীতে প্রাণের যাত্রা শুরু। কে জানে।