২১শে ফেব্রুয়ারি২০১৫

খবরকাগজ
  • মাতৃভাষার লড়াইয়ের এক শহিদ--পোট্টি শ্রীরামুলু




    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য


    ১৯০১ সালে নেলোর জেলায় জন্ম। সেখান থেকে দুর্ভিক্ষের তাড়নায় সপরিবারে মাদ্রাজ।একেবারেই সাদামাটা মানুষ। পেশায় রেলের স্যানিটারি ইঞ্জিনিয়ার। বিয়ে হয়েছে সবে কিছুদিন। এমন মানুষ তো লক্ষ লক্ষ ঘুরে বেড়ান চারপাশে। জনমান, বড়ো হন, চাকরি করেন তারপর বুড়ো হয়ে মরে যান। পোট্টির জন্য অবশ্য অন্য পরিকল্পনা ছিল বিধাতার। তাঁর যখন আঠাশ বছর বয়েস তখন ভাগ্যের মোচড় শুরু হল তার জীবনে। একসঙ্গে স্ত্রী আর সদ্যোজাত সন্তান দুজনকেই হারিয়ে বসলেন তিনি। সেটা ১৯২৮ সাল।

    হঠাৎ করেই পৃথিবীটা বদলে গেল পোট্টি শ্রীরামালুর। ১৯৩০ সালে চাকরিবাকরি ছেড়ে গিয়ে উঠলেন গান্ধীজির সবরমতির আশ্রমে। দেশ তখন লবন সত্যাগ্রহে উত্তাল। তাইতে যোগ দিয়ে জেলে গেলেন তিনি। তারপর গান্ধীজির সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতাকামী আন্দোলনে ক্রমাগত এগিয়ে চলা।অংশগ্রহন করলেন ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহে, ভারত ছাড়ো আন্দোলনেও। এই সময়েই গান্ধীজিকে একবার বলতে শোনা গেছিল, 'এর মত আর এগারোটা কর্মী পেলে আমি এক বছরে দেশটাকে স্বাধীন করে দিতে পারি--'

    একদিকে দেশ যত স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে চলেছিল ততই গান্ধীজির অন্যান্য প্রধান শিষ্যরা যেমন জওহরলাল নেহরু , প্যাটেল ইত্যাদিরা আন্দোলনের পুরোভাগে এগিয়ে এসে নেতা হয়ে উঠছিলেন। বোঝা যাচ্ছিল, দেশ স্বাধীন হলে এঁরাই হবেন তার শাসক। পাশাপাশি পোট্টি কিন্তু তখন চলেছেন একেবারে উলটো পথে। ১৯৪৩-৪৪ সালে এসে দেখা যাচ্ছে তিনি চলে গিয়েছেন নেলোর জেলার ভেতরে। কাজ করছেন চরকা সংস্কৃতির প্রসারের জন্য। এর কিছুদিন পরে, দেশ যখন স্বাধীনতার উন্মাদনায় কাঁপছে, গান্ধীজির মতের বিরুদ্ধে গিয়ে দেশকে দু টুকরো করছেন তাঁরই শিষ্যরা, আর তার ফলে হিন্দুমুসলমানের রক্তে দেশ ভাসছে, পোট্টি কিন্তু তখন নিঃশব্দে লড়াই করে চলেছেন অস্পৃশ্য অন্ত্যজ মানুষদের উন্নয়নের জন্য। ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত পরপর তিনটি বড়োসড়ো অনশন করেছেন, ছিনিয়ে এনেছেন বেনুগোপালস্বামী মন্দিরে হরিজনদের প্রবেশাধিকার, সরকারকে বাধ্য করেছেন আদেশ দিতে যে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা সপ্তাহে একদিন দলিতদের উন্নয়নের জন্য নিয়ম করে কাজ করবেন।
    একই গুরুর শিষ্য তাঁরা। সে শিষ্যদের একদল তখন দিল্লির সিংহাসনে বসেছেন। সারা পৃথিবীর সব ক্যামেরার আলো তাঁদের মুখে। একসময় তাঁদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করা পোট্টি শ্রীরামালু কিন্তু মন্ত্রী হন নি। দলিতদের উন্নয়নের জন্য স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে করে নেলোরের পথে খালি পায়ে হেঁটে চলেন তিনি তখন প্রখর রৌদ্রে, দলিত মানুষদের জন্য সচেতনতা তৈরির মিশন নিয়ে। উচ্চবর্ণের মানুষরা তাঁকে গাল দেয়, তাঁর নিজের বর্ণের মানুষরাও গাল দেয়। পোট্টি সব শোনেন, তারপর ফের এগিয়ে নিয়ে চলেন গুরু গান্ধীজির দর্শনকে।

    ১৯৫০ সাল। সর্দার প্যাটেল মারা গেলেন। নেহরুজি তখন ভারতবর্ষের শাসনে একেবারেই শেষ কথা। সকলে তাঁকে ভগবানের মতন মানে। তিনি যা বলবেন সেই পথে ভারত চলবে তখন। শুধু একটাই ব্যতিক্রম ছিল এ নিয়মের।সেটা হল ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য তৈরির দাবি। ব্যাপারটা একটু ভেঙে বলা যাক--


    সাহেবরা ইংরিজি বলত। নেটিভদের ভাষা নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা ছিল না। দেশটাকে তারা তাদের সুবিধেমত কিছু প্রদেশে ভাগ করে নিয়েছিল শাসনের সুবিধের জন্য। আবার দেশের খানিক খানিক ছিল আধা স্বাধীন দেশিয় রাজাদের অধিকারে। ফলে প্রায়শই দেখা যেত, একই মাতৃভাষায় কথা বলা মানুষজন, একই এলাকা জুড়ে তাঁরা রয়েছেন হাজারো বছর ধরে, অথচ সরকারের সুবিধের জন্য তাঁদের একদল রয়েছেন এক প্রদেশে, আর অন্যদল অন্য প্রদেশে। বিভিন্ন ভারতীয় ভাষাভাষী মানুষদের এ ছিল এক বিরাট ক্ষোভের কারণ। তাঁরা চাইতেন এক মাতৃভাষার মানুষজন একত্রে থাকুন। মানুষের এই ইচ্ছেটাকে সম্মান দিয়ে ১৯২০র দশকে জাতীয় কংগ্রেস একটা ঘোষিত নীতি অবলম্বন করেছিল, তা হল স্বাধীনতার পর ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য গড়া। ১৯৪৫-৪৬ সালে ভোটের কাগজে জাতীয় কংগ্রেস ফের বলেছিল, ভারতবাসীর মাতৃভাষার ভিত্তিতে রাজ্য দেয়ার নীতিতে তারা অনড়। অথচ স্বাধীনতার পরে ভারতবাসী দেখল, স্বাধীন ভারত সরকার সে কথা ভুলে গিয়েছে একেবারে।প্রধানমন্ত্র ী জওহরলাল নেহরু একেবারেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন এই ব্যাপারে।

    এই একটা ব্যাপারে দেশ তাঁর সঙ্গে একমত ছিল না। এমনকি তাঁর নিজের শাসক দলেও মারাঠি,গুজরাটি, কন্নড়,ওড়িয়া,মালয়ালাম প্রত্যেক মাতৃভাষার সদস্যও তখন মনে মনে চাইছেন , জাতীয় কংগ্রেস তার প্রতিজ্ঞা রাখুক। এক মাতৃভাষার মানুষের জন্য একই প্রদেশ তৈরি করে মাতৃভাষার প্রতি ভারতবাসীর ভালোবাসাকে সম্মান দিক।

    এই নিঃশব্দ দাবির মুখে প্রথম ভাষা জোগালেন তেলুগুভাষী অন্ধ্র মানুষজন। তখন তাঁরা মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির অধীনে থাকেন। সেখানে তামিলভাষীদের আধিপত্য। ওদিকে বাংলা ভাগ হয়ে যাবার ফলে হিন্দির পরেই সবচেয়ে বেশি ভারতীয়ের মাতৃভাষা ছিল তেলুগু। অতএব মাদ্রাজ বিধানসভার তেলুগু সদস্যরা আন্দোলন শুরু করলেন। তাঁদের নিজস্ব অন্ধ্র রাজ্য চাই। ১৯৫১ সালের বর্ষাকালে এ নিয়ে অনশনে বসলেন সন্ত সীতারাম। পাঁচ সপ্তাহ অনশনের পর বিনোবা ভাবের অনুরোধে অনশন ভাঙল, ভারত সরকার মচকাল না। জওহরলাল নেহেরু এবং মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির মুখ্যমন্ত্রী রাজাগোপালচারী দুজনেই এক সুরে বললেন অন্ধ্রপ্রদেশের সৃজন মোটেই ভালো কাজ হবে না এবং হলেও তা হবে তাঁদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে। তার ওপর ১৯৫২ সালের মে মাসে লোকসভায় জওহরলাল যে বক্তৃতা দিলেন, তার মধ্যে ইঙ্গিত রইল, মাতৃভাষার ভিত্তিতে রাজ্যের দাবিটা দেশের একতার পরিপন্থী, এবং যদিও কিছুকিছু ক্ষেত্রে তা কাম্য, কিন্তু এখন সে সবের সময় নয়। যখন সময় আসবে তখন ওসব ভেবে দেখব।
    নিজেদের দেয়া কথাই এইভাবে ভুলে গেল জাতীয় কংগ্রেস। গান্ধীজির এক শিষ্য ক্ষমতার মাথায় বসে মাতৃভাষাকে অপমান করে বসলেন রাজনীতিকে তার ওপরে স্থান দিয়ে। গান্ধীজি তখন বেঁচে নেই। তাঁর অন্য শিষ্যটি নেল্লোরের পথে খালি পায়ে ঘুরে ঘুরে তাঁর অহিংসার বাণী প্রচারে মগ্ন ছিলেন। কিন্তু এইবারে তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। মাতৃভাষার সম্মানরক্ষার প্রয়োজনে তেলুগুভাষাভাষীদের নিজস্ব রাজ্যের দাবিতে তিনি যুদ্ধে নামলেন, এককালের গুরুভাই ও সতীর্থ, দেশের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে। দুই শিষ্যকে নিজের হাতে গড়ে একজনকে গুরু দিয়ে গিয়েছিলেন রাজ্যপাট, আর অন্যজনকে দিয়ে গিয়েছিলেন আত্মার শক্তি। যে যার শক্তিকে অবলম্বন করে এবারে মুখোমুখি হলেন লড়াইয়ের ময়দানে। ১৯৫২ সালের ১৯ অক্টোবর মাদ্রাজে আমরণ অনশনে বসলেন পোট্টি। দাবি একটাই তাঁর মাতৃভাষাভাষীদের জন্য একটা রাজ্য চাই। জাতীয় কংগ্রেস ভারতবাসীকে দেয়া তার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করুক।
    দেশের রাজামশাই নেহরু কিন্তু তাকে পাত্তাই দিলেন না। রাস্তায় ঘুরে বেরানো একটা খালি পা ফকিরকে দেশের প্রধানমন্ত্রীর না চিনতে পারবারই কথা। ডিসেম্বরের তিন তারিখে ভারী অবজ্ঞা ভরা একটা চিঠি এল রাজাগোপালচারীর কাছে। তার বক্তব্য, অন্ধ্র প্রদেশের দাবিতে কি একটা যেন অনশন চলছে হে? আমার কাছে
    ঘনঘন টেলিগ্রাম আসছে ওই নিয়ে। ওতে আমার কোন হেলদোল হবে না জানবেন। আমার প্রস্তাব,ব্যাপারটাকে পাত্তা দেবেন না--
    পোট্টি তখন ছ সপ্তাহ উপোসী আছেন। মৃত্যুর মুখে এসে দাঁড়িয়েও মাতৃভাষার অধিকারের দাবীতে আঁকড়ে রয়েছেন গুরুর দেখানো পথটিকে। এইবারে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাইরে বের হয়ে এল। মাতৃভাষার ভিত্তিতে রাজ্যের দাবিতে তেলুগু মানুষদের তীব্র আন্দোলন দাবানলের মতন ছড়িয়ে পড়তে লাগল অন্ধ্রভূমির দিকে দিকে।

    পোট্টি শ্রীরামালুকে তাচ্ছিল্য করে যে বিরাট একটা ভুল করে ফেলেছেন সেটা বুঝতে দেরি হলনা প্রধানমন্ত্রীর। ডিসেম্বরের ১২ তারিখে রাজাগোপালচারীকে ফের এক চিঠিতে তিনি বিপরীত সুরে কথা বললেন। জানালেন, মাতৃভাষার ভিত্তিতে অন্ধ্রদের একটা প্রদেশ তৈরি করবার ব্যাপারে আর কোন আপত্তি নেই তাঁর।
    খবরটা টালবাহানা করে প্রকাশ করতে দেরি করছিল মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি সরকার। ফলে অনশন চালু রইল এবং ১৫ তারিখে পোট্টি প্রাণ দিলেন তাঁর মাতৃভাষা তেলুগুর সম্মানরক্ষার যুদ্ধে সে ভাষাভাষীদের জন্য নিজস্ব রাজ্যের দাবিতে।




    এইবারে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল তেলুগুভাষীদের। বিদ্রোহের দাবানল লাগল চারদিকে। তার প্রবল উত্তাপ বাধ্য করল কংগ্রেসকে, দ্রুত পদক্ষেপ নিতে। ১৬ ডিসেম্বর জওহরলাল ঘোষণা করলেন যে অন্ধ্রপ্রদেশ তৈরি হবে।আর, তার পরের বছর সৃষ্টি হল ভারতবর্ষের প্রথম মাতৃভাষাভিত্তিক রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশের।

    মাতৃভাষার সম্মানরক্ষার জন্য শহিদ হওয়া পোট্টি শ্রীরামুলুর কৃতিত্ব কিন্তু শুধু অন্ধ্রের সৃজনে সীমাবদ্ধ নেই। ওর পরে যে ধারাবাহিকভাবে ভারতে একের পর এক মাতৃভাষাভিত্তিক রাজ্যগুলো তৈরি হয়েছে এবং এখনও হয়ে চলেছে (কিছুদিন আগেই তৈরি হল তেলেঙ্গানা) তার সূচনার কাজটা করে দিয়ে গিয়েছিলেন তিনি নিজের প্রাণ দিয়ে। তা ছাড়াও একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তার জনগনের ইচ্ছেই শেষ কথা হওয়া উচিত। ভারতবর্ষের মানুষেরা স্বাধীনতার পরে মাতৃভাষার ভিত্তিতে রাজ্যের দাবি সরকারকে মানতে বাধ্য করে সারা পৃথিবীর কাছে প্রমাণ করে এ দেশে গণতন্ত্রের ভিত কতোটা মজবুত।

    জওহরলাল নেহেরু ভয় পেয়েছিলেন মাতৃভাষার ভিত্তিতে প্রদেশ সৃজন করলে তা বুঝি ভারতের একতার ক্ষতি করবে। আর সেইজন্যেই একসময় যাঁর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন সেই গুরুভাইটিকেও মৃত্যুর দিকে এগিয়ে দিতে সংকোচ করেন নি। কিন্তু আমরা ভারতীয়রা প্রমাণ করে দিয়েছি, তাঁর এই ভয় মিথ্যে ছিল। মাতৃভাষার ভিত্তিতে নিজের নিজের প্রদেশ তৈরি করলেও তাতে দেশের কোন ক্ষতি হয় না। তাই আজ এতগুলো স্বীকৃত ভাষা নিয়েও, এতগুলো মাতৃভাষাভিত্তিক রাজ্য নিয়েও ভারতবর্ষ দুনিয়ার এক অন্যতম ঐকবদ্ধ শক্তি।

    আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়ে যাওয়া এই বিস্মৃত শহিদকে জয়ঢাক সশ্রদ্ধ প্রণাম জানায়।