--

খবরকাগজ
  • জানালায় সুপারহিরো
    তনুশ্রী চক্রবর্তী


    ১০ই জানুয়ারী, ২০১৩, চিল্ড্রেন হসপিটাল, ১২তলা, পিটার্সবুর্গ, ফ্লোরিডা, সকাল ন’টা।
    নার্সদিদি সেই বিচ্ছিরি ওষুধটা খাইয়ে দিয়ে গেছে – কাজে যাবার আগে বাবা-মা দেখাও করে গেছেন। এখন অ্যালেক্স-র করে কী? মা সকালে একটা কমিক বই দিয়ে গেছে – সেটা পড়া আর বিকেলের জন্য বসে থাকা – আবার কখন বাবা-মা আসবেন। সঙ্গে হয়তো ছোট্ট ভাইটাও।
    কি একটা শক্ত অসুখ হয়েছিল ওর –সেরে এসেছে প্রায় – তাও আরো কিছুদিন থাকতে হবে এখানে। একটুও ভালো লাগেনা ওর – সামার চলে গেল- পুলে হুটোপুটি হল না, স্কুলে যায়নি কতদিন। হসপিটালের করিডোরে হাঁটতে মন খারাপ হয়ে যায়। যে বন্ধুদের সাথে ঝাঁক বেঁধে দুষ্টুমি করেছে এতদিন, তাদেরই মত কেউ কেউ শুয়ে আছে মুখে অক্সিজেন মুখোশ পড়ে, কারোর হাতে লম্বা নল চলে গেছে পাশের মেশিনে, কেউ বা মন খারাপ করে জানলার বাইরে তাকিয়ে, কেউ ওরই মত ছোট্ট সাবধানী পা ফেলে নার্সদিদির হাত ধরে হাঁটছে।
    মায়ের দেওয়া বইটাই খুলে বসল শেষ অবধি – রোদ্দুরের আলোয় বই পড়তে বারন করেছে মা, তাই জানলার দিকে পিঠ ফিরিয়ে নিজের ছায়ায় বইটা আড়াল করে। হঠাত সেই ছায়ার পাশে আরো একটা ছায়া এসে পড়ল। ঘাড় ঘুরিয়ে বাইরে তাকায় অ্যালেক্স...
    আরে! জানলার বাইরে এ কী দেখছে ও এবং আরো সবাই?? স্পাইডারম্যান? জানলা পরিস্কার করতে এসেছে?
    ওয়ার্ডে বাচ্চাদের আনন্দিত চিৎকারে কান পাতা দায় – অন্য জানলায় ততক্ষনে হাজির সুপারম্যান, ব্যাটম্যান আর ক্যাপ্টেন অ্যামেরিকা... বাচ্চারা, তাদের বাবা মায়েরা , ডাক্তার-নার্স সবাই হাসছে আনন্দে ... কারোর কারোর চোখে আবার জল... বাচ্চাদের সামলাতে নার্সদিদিরা হিমসিম – সবাই চায় সুপারহিরোদের কাছে থেকে দেখতে – কাচের মধ্যে দিয়ে থেকে মিছিমিছি হাত মেলাতে... হাসপাতালের বিষন্ন পরিবেশে আজ কার্নিভালের খুশি ছড়িয়ে পড়েছে...
    ভাবছো গল্প?মোটেই না – একদম সত্যি –


    আমেরিকার বড়বড় আকাশছোঁয়া বাড়িগুলোর জানলা পরিষ্কার করা যাদের পেশা, সেরকম একটি প্রতিষ্ঠান ক্লিয়ারওয়াটার্স হাই রাইজ উইন্ডো ক্লিনার্স-এর কর্তারা একদিন ঠিক করেন শিশু হাসপাতালের বাচ্চাদের মুখে একদিন হাসি ফোটালে কেমন হয়? আর শুধু শিশুদের নয়, এই হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা তাঁদের কর্মীরাও বলেছেন যে দিনের পর দিন জানলা দিয়ে ছোট ছোট অসহায় শিশুদের রুগ্ন মুখ দেখে তারাও হতাশায় ভোগেন...
    তাই হঠাৎ একদিন তৈরি হল ব্রডওয়ে স্টাইলের মহার্ঘ কস্টিউম – কাজে লাগানো হল কিছু অতি সুদক্ষ কর্মীকে – যারা হাসপাতালের ছাদ থেকে সেফটি হার্নেস লাগিয়ে নেমে এলেন হাসপাতালের বিভিন্ন তলার জানলায় জানলায় উঁকি দিয়ে কিছু বাচ্চার জীবনের অন্ততঃ একটি দিনকে বিশেষ রঙে রাঙিয়ে দিতে... আনন্দ ছড়িয়ে দিতে সবার মধ্যে – নির্বিচারে...
    সেই শুরু – তারপর এই উদ্যোগে আপ্লুত হয়ে আরো অনেক উইন্ডো ক্লিনার কোম্পানি এগিয়ে আসে একই পথে চলতে – আমেরিকা আর ব্রিটেনে - পর্দার আর গল্পের বইয়ের কাল্পনিক সুপারহিরোদের সত্যি সত্যি সুপারহিরোতে রূপান্তরিত করতে-অন্তত একদিনের জন্যে – যে দিনটার আনন্দের আর চমকের স্মৃতি সেই ছোটরা বহন করবে আজীবন – আর তাদের পোড় খাওয়া গুরুজনরাও ভাববে – পৃথিবীটা নেহাত মন্দ জায়গা নয়!