৮ মার্চ ২০১৬

খবরকাগজ
  • শিশা আবুউ দাউ এল-নেমার - ইজিপ্টের এক শহরের এক অন্যরকম মা- উমা ভট্টাচার্য



    আজ আন্তর্জাতিক নারীদিবস। যেমন মাদারস’ ডে, ফাদারস’ ডে, চিলড্রেন্স ডে তেমনি ওমেনস্ ডে একটি দিন। সেদিনটা পৃথিবীর সব মেয়েদের জন্য, তাঁদের আনন্দের দিন,তাঁদের নিয়ে নানা অনুষ্ঠানের দিন, প্রিয়জনদের কাছ থেকে উপহার পাওয়ার দিন।এদিনটিতে আবার নানা দেশে নানা বিষয়ে কঠিন আর প্রশংসার যোগ্য কাজের জন্য সরকার থেকে বা কোনও সংস্থার থেকে মেয়েদের পুরস্কার দেওয়া হয়,সম্মানিত করা হয়। সেসব কাজ করতে গিয়ে তাঁরা অনেক বাধার মুখে পড়লেও তা কাটিয়ে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছে যান। তাই তাঁদের সম্মানিত করা হয়।
    আজ এখানে সেইরকম এক ব্যতিক্রমী মায়ের কথা জানাব। মিশরের ইজিপ্ট শহরে বাস এই মায়ের। নাম তাঁর শিশা আবুউ দাউ এল-নেমার।তিনি নিজের অজান্তেই নিজের আর নিজের শিশু মেয়েটির প্রাণ বাঁচানোর জন্য যে অভাবনীয় কাজ করে গেছেন তা সত্যিই অবাক করার মত।দীর্ঘ ৪৩ বছর যে কেঊ এভাবে ছদ্মবেশ ধরে, সমাজের নিয়মবিধাতাদের চোখে ধুলো দিয়ে, নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের লক্ষে পৌঁছুতে সফল হতে পারেন তা শিশা আবুর জীবনকথা না জানলে বিশ্বাস করা যেত না।
    আমাদের দেশে যেমন আগেকার দিনে মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর নিয়ম ছিলনা,ব্যবস্থাতো ছিলই না। রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর, ডেভিড হেয়ার, বেথুন সাহেব, এঁদের মত সমাজবন্ধু মানুষদের চেষ্টায় মেয়েদের সামনে লেখাপড়া শেখার দরজাটা খুলে গিয়েছিল।
    কিন্তু ইজিপ্টের সমাজব্যবস্থায় পুরুষদের কথাই ছিল শেষ কথা, তাদের সমাজে মেয়েদের লেখাপড়া শেখনোর বিধান ছিলনা ।মেয়েদের ওপর ছিল তীব্র ধর্মীয় বাধা নিষেধের বোঝা । তাঁরা লেখাপড়া শিখতে পারবেনা, তাঁরা কজ করে খেটে খেতে পারবেনা, বাইরে বেরোতে পারবেনা। স্বামী মারা গেলে তাঁর দায়িত্ব কেউ নেবেনা, তাঁকে সমাজের গুরুমশাইদের বিধান মেনে আবার বিয়ে করে অন্য স্বা্মীর সঙ্গে চলে যেতে হবে ।সে না খেয়ে মরলেও পয়সার বিনিময়ে কোনও কাজ করে নিজের ঞ্জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেনা।এতসব না-এর মুখোমুখি হতে হয়েছিল লেখাপড়া না জানা গ্রামের মেয়ে শিশা আবুউকে।
    শিশা আবুউর ষোল বছর বয়সেই বিয়ে হয়ে যায়। মোটামুটি ভালই কাটছিল দিনগুলি। যখন তাঁর মেয়েটি জন্মাবে তার আগেই মারা গেলেন শিশার স্বামী।মেয়ের জন্ম পর্যন্ত আর জন্মাবার পর তাঁদের সমাজের নিয়মমত ৪০ দিন থাকতে দিল শ্বশুরবাড়ির লোকজন। এরপর তাঁর নিজের আর মেয়ের খরচ কেউ চালাতে চাইল না। তাঁকে ওঁদের সমাজের মাথাদের বিধানমত আবার বিয়ে করতে বলা হল।শিশা একটু অন্য প্রকৃতির মেয়ে ছিলেন। তাঁর প্রিয় স্বামী মারা গেছেন বলে,আর নিজের সদ্যোজাত শিশুকন্যার নিরাপত্তার কথা ভেবে আবার বিয়ে করতে রাজি হলেন না। শ্বশুর বাড়ির লোকজন তাঁকে তাড়িয়ে দিল।এসে উঠলেন বাপের বাড়িতে। ইচ্ছা মেয়েকে মায়ের জিম্মায় রেখে অর্থ উপার্জনের জন্য কাজ করবেন। বাদ সাধল ভাইয়েরা। তাদের বাড়িতে থেকে মেয়ে হয়ে শিশা কাজ করতে বেরোলে তারা সমাজে বাস করতে পারবেনা এই ভয়ে তাঁরা বারণ করলেন।শিশা কী করবেন ভেবে ভেবে ক্লান্ত হয়ে ঠিক করলেন,বাড়ি ছেড়ে তো চলে যাবেনই, এই জায়গা ছেড়েই চলে যাবেন।
    নিজের আর মেয়ের ভরনপোষণ তিনি নিজেই করবেন এই প্রতিজ্ঞায় অটল শিশা চললেন অনেক দূরে, কোন এক জায়গায় যেখানে কেঊ তাঁকে চেনে না, জানে না। ভাবতে ভাবতে ঠিক করলেন মেয়েদের পোশাকে থাকলে তিনি তো কোনও কাজই পাবেন না,আর একলা মেয়ে দেখে দুষ্টূ লোকেরাও উৎপাত করবে।সেই তিনি ঠিক করলেন পরিচয় গোপন করে,পুরুষের বেশে তিনি থাকবেন। তাতে কাজ পেতে তাঁর কোনও বাধা আসবে না, কারণ পুরুষদের তো কাজ করতে বাধা নেই।
    সেইমতই কাজ করলেন। প্রথমেই মেয়েদের প্রিয় মাথার চুলগুলো কেটে ন্যাড়া হলেন। মাথায় বাঁধলেন পুরুষের মত পাগড়ি, আর গায়ে পরলেন পুরুষদের ঢোলা জামা আর ঢোলা পাজামা। নিজেকে দেখে নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। চেনাই যেত না তিনি মহিলা বলে।
    এইবার কাজ নিলেন স্থানীয় ইটভাটায়। রোজ রাশি রাশি ইট বানাতেন। যখন ইটভাটায় কাজ কম থাকত, তখন মাঠে চাষীদের সঙ্গে জনমজুর খাটতেন; পাকা গম কাটতেন। সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করতেন, বাসায় ফিরে মেয়েকে নিয়ে মেতে উঠতেন। চিন্তা তাঁর, মেয়েকে ভালভাবে মানুষ করতে হবে,একটু লেখাপড়া শেখাতে হবে, তার বিয়ে দিতে হবে।
    তখন তাঁর বয়স কম,একাই দশটা পুরুষের সমান খাটতে পারতেন। অতিরিক্ত খাটুনিতে শরীর ভেঙে পড়তে লাগল। অসুখ করলে ডাক্তার দেখান না ,পাছে ধরা পড়ে যান যে তিনি একজন মেয়ে। তাহলেই সর্বনাশ।এদিকে মেয়েও বড়ো হচ্ছে। তাকেও কাছে থেকে দেখভাল করা দরকার। তখন আয়ের বিকল্প রাস্তা বেছে নিলেন, জুতো পালিশের কাজ ধরলেন। বাড়ির কাছে রাস্তায় বসেই কাজ করা যায়, বাড়ির কাজও মাঝেমাঝেই সেরে আসা যায়, মেয়েকে সঙ্গও দেওয়া যায়।
    পুরুষের বেশ ধারণ করে, সমাজের অন্যায় অনুশাসনকে উপেক্ষা করে এইভাবেই কাটিয়ে দিলেন জীবনের ৪৩টা বছর।কোনদিন সাজগোজ করেন নি। আজ তাঁর বয়স ৬৫ আর তাঁর আদরের ছোট্ট মেয়েটির বয়স এখন ৪৩ বছর। বিয়ে দিয়েছেন তাঁকে।তাঁর নাতিনাতনি হয়েছে। জামাই অসুস্থ হয়ে পড়ায় আয় করতে অক্ষম। তিনি রোজ সকালে কাজে বেরোবার আগে নাতি নাতনিদের খাবার ঢাকা দিয়ে রেখে যান খাবার টেবিলে।
    এখন অবশ্য তাঁকে আর পরিচয় গোপন করে থাকতে হয় না। ১৯৭০ সালে যখন তিনি এই জীবন শুরু করেছিলেন সে সময়ে যে রকম সমাজের অবস্থা ছিল, এখন সেই সমাজের খানিকটা পরিবর্তন হয়েছে। যে সমাজের ভয়ে তিনি এই জীবন শুরু করেছিলেন,সেই সমাজের কাছেই তিনি আজ এক শ্রদ্ধেয় মানুষ, এক দৃঢ়চেতা আত্মত্যাগী নির্ভীক মা। অবশেষে দেশের সরকার জানতে পেরেছেন তাঁর কথা। ২০১৪ সালের ১৪ই মার্চ সরকার তাঁকে একজন ‘আদর্শ মা’এর সম্মানে ভূষিত করেছেন। ইজিপ্টের প্রেসিডেন্ট স্বয়ং তাঁর হাতে তুলে দিয়েছেন “শ্রেষ্ঠ মাতৃত্ব” পুরস্কার। আজ ছোটোবড়ো সবাই জানে তিনি একজন মহিলা।



    এখনও তিনি পুরুষের পোশাকই পরেন। সারা জীবন যে পোশাকটি তাঁকে বাঁচিয়েছে, পরের দয়ায় বা ভিক্ষে করে খাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছে, মেয়ে হয়েও তিনি সেই পোশাকের সাহায্যেই কাজ করে সসম্মানে বেঁচে থেকেছেন, সেই পোশাকের সম্মান তাঁর কাছে অনেক। তিনি বলেন, “আমি ঠিক করেছি আমৃত্যু আমি এই পোশাকই পরব।এই পোশাকেই আমি এত অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে আমি আর এই বেশ ছাড়তে পারবনা”।
    এখন অবশ্য তাঁকে আর জুতো পালিশ করতে হয় না। লাক্সৌরে কিছু অত্যাবশ্যকীয় গেরস্থালি জিনিসের একটি কিয়স্ক চালান।এখনো তিনি আগের মতই শান্ত, ধীরস্থির, কাজপাগল, উদ্যমী মানুষ।
    এমন মা কি সত্যি অন্যরকম মা নয়! আজ আন্তর্জাতিক নারীদিবসে জয়ঢাকের তরফে আমি তাঁর মত মাকে জানাই শ্রদ্ধা,আর সম্মান।