২৬ অক্টোবর ২০১৪

খবরকাগজ

  • লিলিপুটের খেল
    কিউবস্যাটের অভিযান



    তার মাপ মাত্রই ১ ইউ, মানে ১০ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ প্রস্থ ব্যাসের একটা ঘনক। ওইটুকু হলে কী হয়, মহাকাশ গবেষণায় এখন তার বেজায় সুনাম। দেশবিদেশের রকেটের মাথায় আটকানো দৈত্যাকার মহাকাশযানদের পাশে পাশে এইসব লিলিপুট মহাকাশযানও আজকাল দিব্যি পাড়ি দিচ্ছে মহাকাশে।কাজ করবার ক্ষমতা তাদের বেশি নয়, এই ধরো কিছু ভালো ছবি তুললো, কিংবা তার পেটের ভেতরে একটা পরীক্ষার উপকরণ বসিয়ে দেয়া হল, যা সে পেটে করে মহাকাশে ঘুরে বেড়ালো, আর তার থেকে কিছু তথ্যটথ্য পেয়ে গেলো তার নির্মাতা, এইরকম আর কি। ছোটো হওয়ায় খরচও কম। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও ছাত্রদের তৈরি কিছু কিছু পরীক্ষানীরিক্ষার জন্যে তার এখন বাজারে বেজায় কদর হয়েছে। এদের কেতাবি নাম কিউবস্যাট। অন্য নাম ন্যানোস্পেসক্রাফট।

    < br />

    নাসার গডার্ড স্পেসফ্লাইট সেন্টার এর একজন লিড সায়েন্টিস্ট, বা বলতে পারো, প্রথম সারির বৈজ্ঞানিক নীরব শা তাঁর দুই সহকর্মী সেম্পার ও ক্যালহনকে নিয়ে এই অতিসাধারণ কিউবস্যাটকে ব্যবহার করেই গড়ে তুলছেন এক আশ্চর্য মহাকাশ টেলিস্কোপ।


    মহাকাশে যে টেলিস্কোপ যান পাঠানো হয় তাদের একটা বড়ো সমস্যা হল সরাসরি সূর্যের আলো। দূর আকাশের দিকে দেখতে গেলে মহাকাশ টেলিস্কোপকে তার চোখ খুলে রাখতেই হবে, আবার সে কাজটি করতে গেলে তাতে পড়বে সূর্যের চড়া আলো। ওতে তার দেখবার শক্তি যাবে বেজায় কমে। সরাসরি চোখে আলো পড়লে তেমনটাই তো হয়। আমাদের মানুষদেরও তাই হয়, তাই না?

    নীরব এইখানেই তাঁর নতুন পথের ভাবনাটাকে খাড়া করিয়ে দিয়ে চমকে দিয়েছেন বিজ্ঞানের দুনিয়াকে।

    মূলনীতিটা খুবই সহজ। একটা স্পেসকিউবে থাকবে ছোট্ট অথচ শক্তিশালী দূরবিন। আর অন্য স্পেসকিউবিটার কাছে সেসব কিচ্ছু থাকবে না।তার বদলে থাকবে একটা ছাতা(মানে ছোট্ট একটা চাকতি আর কি) দুজনে সবসময় পাশাপাশি উড়বে পৃথিবীর কক্ষপথে আর দুনম্বর স্পেসকিবটা এক নম্বরের লেন্সের ওপর ছাতার মতন করে ছায়া ফেলে রাখবে যাতে সুর্যের চোখপোড়া আলোয় তার চোখ ঝলসে না যায়। বিজ্ঞানীদের অনুমান এতে করে মহাজাগতিক বস্তুদের অনেকগুণ বেশি উজ্জ্বল আর নিখুঁত ছবি তুলে ফেলা যাবে।

    নীরবের কিউবস্যাট জুটি প্রথমে সূর্যের কীরিটিমুকুট বা করোনা-র নিখুঁত ছবি তুলবে। সেটা সে ঘটাবে একটা কৃত্রিম সূর্যগ্রহণ ঘটিয়ে। কীভাবে? দেখো, সূর্যগ্রহনটা ঘটে সখন চাঁদের ছায়া এসে পৃথিবীর বুকে পড়ে। যেখানে সে ছায়া পড়ে সেখান থেকে সূর্যটাকে দেখা যায় না। শুধু চাঁদের ছায়াটার চারপাশে একটা উজ্জ্বল আলোর আংটি দেখা যায়, যাকে বিশ্লেষণ করলে সুর্যের অনেক রহস্য ধরা পড়ে যাবে। অতএব মহাকাশে উড়ে গিয়ে একটা কিউব এমন করে দু নম্বর কিউবের সামনে সামনে উড়তে থাকবে যাতে দু নম্বর কিউবটার গায়ে সূর্যগ্রহনের মত তার ছায়া পড়ে।ফলে দ্বিতীয়, টেলিস্কোপওয়ালা কিউবটার চোখে পড়বে সূর্যের কিরিটীমুকুটটা। চোখে আলো না পড়ায় অন্য টেলিস্কোপের তুলনায় এই ক্ষেত্রে অনেক ভালো মানের ছবি তোলবার উপায় থাকবে তার।
    নীরব শা-র বক্তব্য, শুধু সূর্যের কিরিটীমুকুটই নয়, ব্ল্যাক হোল কিংবা বহু আলোকবছর দূরের কোন তারার চারপাশে ঘুরতে থাকা অন্য কোন গ্রহ আবিষ্কারেও খুব কাজে আসবে এই কিউবস্যাট দুরবিন।

    জোরকদমে কাজ চলেছে এখন নীরব আর তার সঙ্গীদের। কাজটা কতোটা কঠিন তার একটু আন্দাজ দিচ্ছি। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে এরোপ্লেনদের নির্দিষ্ট নকশাবন্দি উড়ান বা ফর্মেশন ফ্লাইটের কথা তো শুনেছি। সেসব প্লেনে মানুষ বসে থাকে আর হাজারটা যন্ত্র দিয়ে নিজেদের অবস্থান সামলায়। এবারে ভাবো দেখি, কিন্তু মহাকাশের বুকে দুখানা একরত্তি আকারের যান তীব্র বেগে ধেয়ে চলেছে। সেই ছোটবার ফলে প্রতি মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে যানগুলোর অভিমুখ, বদলে যাচ্ছে একটা যানের খুদে টেলিস্কোপটার নিশানা। অন্য ছাতাওয়ালা কিউবস্যাটকে সেটা নজর রেখে ছুটতে ছুটতেই প্রতিমুহূর্তে নিজেকে এমনভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিতে হচ্ছে যাতে তার ছাতাটা ঠিক তার বন্ধু কিউবের দুরবিনের লেন্সের ওপরে থাকে। সেই প্রায় অসম্ভব কাজটাকেই সম্ভব করে তুলছেন নীরব আর তাঁর দুই বিজ্ঞানী বন্ধুতে মিলে।

    শেষ করবার আগে জানাই, এতকাল কিউবস্যাটেরা শুধুই পৃথিবীর চারপাশের নিচু কক্ষপথে পাক খেতো। তাদের যে বিরাট বড়ো বড়ো দাদারা গ্রহগ্রহান্তরে ছোটে সে ক্ষমতা তাদের ছিলো না। এইবার নাসা তাদের সে ক্ষমতাও দিতে চলেছে। নাসার জেট প্রপালশান ল্যাবরেটরির তৈরি একজোড়া কিউবস্যাট এইবারে পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে ডুব দেবে সৌরজগতের গভীরে। প্রজেক্টটার নাম ইন্সপায়ার। তার উদ্দেশ্যই হবে অ্যাত্তোটুকুন যান যে গ্রহান্তরে উড়ে যাবার ক্ষমতা ধরে তার প্রমাণ দেয়া।