৮ আগস্ট ২০১৪

খবরকাগজ
  • রোসেটা চলল ধূমকেতুতে



    প্রাচীন মানবসভ্যতার অনেক রহস্যই ধরা ছিল মিশরের চিত্রলিপি হায়েরোগ্লিফিকস-এ। রোসেটা স্টোন নামের এক পাথরের গায়ে সে ভাষায় কিছু লেখা ও পরিচিত প্রাচীন গ্রিক ও ডেমোটিক ভাষাতে তার অনুবাদ থেকেই পাওয়া গেছিল চিত্রলিপি পড়বার সংকেত। খুলে গেছিল প্রাচীন ইতিহাসের গোপন দরজা।

    সৌরজগতের সৃষ্টির ইতিহাসের ব্যাপের অনেক কিছুই তেমনি লেখা রয়েছে তার আদিযুগ থেকে সূর্যকে ঘিরে ঘুরে চলা ধুমকেতুদের শরীরে। অনেকে অনুমান করেন, এই ধূমকেতুদের পিঠে সওয়ার হয়েই আদি প্রাণকণারা এসেছিল পৃথিবীকে বাড়ি বানাতে।

    প্রাচীন জ্ঞানের সেই ভান্ডারকে খুঁটিয়ে একেবারে কাছে থেকে দেখবার জন্য তাই যখন একটা মহাকাশযান গড়ল ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি, তখন তার নামটাও তাই রাখা হয় 'রোসেটা'।
    তার মিশন হল, "চুরুমভ গেরাসিমেংকো" নামের একটা ধুমকেতুকে (ডাকনাম রবারের হাঁস। কেন, তা তার ছবিটা দেখলে আন্দাজ করতে পারবে) একেবারে কাছে থেকে দেখা আর তার গায়ে একটা ছোট্ট যানকে নামিয়ে ধুমকেতুর মাটি তুলে পরীক্ষা করা। অনেক স্বপ্ন নিয়ে রোসেটা আকাশে উড়েছিল ২০০৪ সালের দোসরা মার্চ। সূর্যকে ঘিরে প্রায় পাঁচটা পাক মেরে প্রয়োজনীয় গতি সংগ্রহ করে নিল সে প্রথমে। সেই করবার পথে কাছাকাছি এসে ভালো করে দেখে নিল লুতেশিয়া আর স্টাইন নামের দুটো গ্রহাণুকেও। কাছে থেকে দেখল বৃহস্পতি গ্রহকেও। তারপর ২০১১ সালে শুরু হল তার ধূমকেতু অভিযানের অন্তিম পর্ব। লম্বা সেই যাত্রায় পথে পড়বে শুধুই খাঁ খাঁ মহাকাশ। পৃথিবী থেকে বেতার সংকেতে আদেশ পাঠিয়ে বিজ্ঞানীরা তখন তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন একেবারে। সে ছিল ২০১১ সালের ৮ জুন।

    তারপর, তিন বছর বাদে তার ঘুম ভাঙানো হল ২০১৪ সালের ২০ জানুয়ারি তারিখে। চোখ মেলে সে দেখল দূরে, আকাশের গায়ে দেখা যাচ্ছে ছোট্ট ধুমকেতুটাকে। তখনও সূর্য থেকে তার দূরত্ব সূর্য-পৃথিবী দূরত্বের প্রায় চারগুণ। তখনও তার তাপমাত্রা মাত্রই (-)৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু তবু সূর্যের যে সামান্য তাপ তখন তার গায়ে পৌঁছোচ্ছে তাতেই শুরু হয়ে গেছে তার গায়ে জমাটবাঁধা বরফের থেকে বাষ্প তৈরি হওয়া।
    ছুটতে ছুটতে অবশেষে আগস্ট মাসের ছ তারিখে রোসেটা এসে পৌঁছেছে মহাকাশের হাঁসের একেবারে দরজার কাছে। একটা ঠোঁটকাটা হাঁসের মত দেখতে আড়াই মাইল লম্বা ধুমকেতুটার গা থেকে মাত্রই

    ৬৫ মাইল দূরে ভাসছে এখন সে। তার পাঠানো ছবি থেকে প্রথমেই যেটা জানা গেছে তা হল,এ ধুমকেতুটা আসলে একটা কনট্যাক্ট বাইনারি, বা দুটো ধুমকেতু জুড়ে গিয়ে সৃষ্টি হওয়া একখানা ধুমকেতু।

    এই মুহূর্তে একটা ত্রিভূজাকৃতি কক্ষপথে ধূমকেতুকে ঘিরে উড়ে চলেছে রোসেটা। (সঙ্গের লিংকের ভিডিওটা দেখে নাওঃ

    Rosetta orbit video

    ছুটে চলেছে তার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের দিকে ঘন্টায় পঞ্চান্ন হাজার কিলোমিটার বেগে। দৌড়োতে দৌড়োতেই রোসেটার ভেতরে থাকা একুশখানা বিভিন্ন যন্ত্র নানাভাবে গবেষণা করে চলেছে ধূমকেতুকে নিয়ে। সূর্যের যত কাছে এগোবে ধূমকেতু তত সে গরম হয়ে উঠবে আর ততই তার শরীর থেকে জলের বাষ্প বের হয়ে তৈরি করবে তার লম্বা লেজটাকে। সেই প্রত্যেকটা পদক্ষেপকে পাশে ভাসতে ভাসতে দেখবে রোসেটা। দেখবে, রেকর্ড করবে, গবেষণা করবে আর সেইসব ফলাফল পাঠিয়ে দেবে পৃথিবীতে বসা বিজ্ঞানীদের কাছে, এ বছরের ৩১শে ডিসেম্বর অবধি।


    রোসেটার মধ্যে এই মুহূর্ত ঘুমিয়ে রয়েছে আরো একটা চমক। তার নাম ফিলে। যে দ্বীপে রোসেটা স্টোন পাওয়া গিয়েছিল তার নামে নাম। সে আসলে একটা ছোট্ট মহাকাশ ফেরিযান। রোসেটা এখন ধূমকেতুর বুকে একটা উপযুক্ত জায়গা খুঁজে চলেছে। জায়গা ঠিক হয়ে গেলে পরে, নভেম্বর মাসে
    ফিলেকে নামিয়ে দেয়া হবে ধূমকেতুর বুকে। মহাকাশ হারপুন ধূমকেতুর গায়ে গেঁথে গিয়ে তাকে

    নোঙর করাবে তার বুকে। তারপর ধুমকেতুর বুকে বসে তার উপাদানকে নিয়ে ফাইল গবেষণা শুরু করবে। খুঁজে ফিরবে পৃথিবীতে প্রাণের উৎসের হদিশ। অভিযাত্রী মানুষের সামনে খুলে যাবে হয়ত জ্ঞানের নতুন দিগন্ত।



    বিজ্ঞান আসলে খুব রোমাঞ্চকর এক রূপকথার অন্য নাম।
    ২০৬১ সালের পটভূমিতে "স্পেস অডিসি"র তৃতীয় খন্ডে আর্থার সি ক্লার্কের কাহিনীতে হ্যালির ধূমকেতুতে মানুষ নেমেছিল গিয়ে। বাস্তবজীবনে তার ৪৭ বছর আগেই মানুষের তৈরি প্রথম যান একটা ধূমকেতুর বুকে গিয়ে নেমে পড়তে চলেছে। এবার লড়াই কল্পনা আর বাস্তবে। কে কাকে হারাতে পারে। কল্পনার ২০৬১ সালের অনেক আগেই কি মানুষ তবে নামতে পারবে ধূমকেতুর বুকে? তার প্রথম ধাপটা পার হলাম আমরা ২০১৪ সালেই। চলো অপেক্ষা করি।