১৩ নভেম্বর ২০১৪

খবরকাগজ
  • ধুমকেতুর বুকে পা রাখল "ফিলে"



    ধুলো আর বরফের অতিকায় পিণ্ডটা গভীর অন্ধকারে একলা একলা ছুটছিলো। তার শরীর থেকে বের হচ্ছে বাষ্পের স্রোত। হঠাৎ গভীর অন্ধকার চিরে তার কাছে উড়ে এলো এক অতিকায় ডানামেলা ফড়িং। খানিক তার কাছে ভাসতে ভাসতে ছুটে চলল সে-ও। ভালো করে দেখে নিল তার গড়ণটাকে। তারপর তার পেট থেকে ছিটকে এলো ছোট্ট একটা বুদ্ধিমান যন্ত্র। ভাসতে ভাসতে ধুমকেতুর গায়ে নেমে এসে দুটো আগুনের তীর ছুঁড়ে নিজেকে আটোকে ফেলল ধুমকেতুর বুকে। বহু দূরে একদল বিচিত্র জীব , যারা ফড়িঙের গতিবিধির ওপর কড়া নজর রেখে চলেছিল এতক্ষণ, তারা তখন আনন্দে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরছে।
    রূপকথা? একদম। তবে সত্যিকারের রূপকথা। ঘন্টাকয়েক আগে মানুষের তৈরি মহাকাশ গবেষণাগার “ফিলে” গিয়ে নেমে পড়েছে রোসেটা নামে একটা ধুমকেতুর বুকে।


    *****

    গল্পের শুরু বহুদিন আগে। প্রথমে কল্পনা। ১৯৮৭ সালে আর্থার সি ক্লার্ক লিখলেন তাঁর স্পেস অডিসি সিরিজের তৃতীয় বই “স্পেস অডিসি ২০৬১”। সেখানে তিনি কল্পনা করলেন, হ্যালির ধুমকেতুতে মানুষ গিয়ে প্রথমবার নামছে ২০৬১ সালে।
    আসলে তখন সত্যিসত্যিই কোন ধুমকেতুর বুকে মহাকাশযান পাঠিয়ে তার খানিকটা পৃথিবীতে গবেষণার জন্য নিয়ে আসা যায় কিনা তার একটা পরিকল্পনা চলছিল। হিসেবকিতেব করে দেখা গেল, তাতে বেজায় খরচ। তখন ঠিক হল তাহলে একটা উড়ুক্কু ল্যাবরেটরিকেই পাঠিয়ে দেয়া যাক ধুমকেতুতে।
    শুরু হয়ে গেল কাজ। তার নাম দেয়া হল প্রজেক্ট রোসেটা। জয়ঢাকের পাতায় তার দীর্ঘ অভিযানের গল্প আমরা আগেই লিখেছি। লেখা হয়েছে কেমন করে তা অতিদীর্ঘ পথ, কখনো ঘুমিয়ে , কখনো জেগে পাড়ি দিয়ে গিয়ে পৌঁছোল “চুরুমভ গেরাসিমেংকো” বা “রাবার ডাক” নামের, অতিকায় হাঁসের মত দেখতে ধুমকেতুটার কক্ষপথে। এই ঠিকানায় সেই খবর পড়তে পাবে

    --(ধুমকেতু অভিযান--আগের গল্প)

    এরপর শুরু হয়ে গেল অন্য কাজ। রোসেটার পেটের ভেতর রাখা ছিল “ফিলে” নামের আরেকটা খুদে যান। সেইটে আসলে একটা মহাকাশ ল্যাবরেটরি। ধুমকেতুর সঙ্গে ছুটতে ছুটতে তার বুকে নামিয়ে দেয়া হবে ফিলে কে।
    গতকাল কাজটা শুরু করতে গিয়ে প্রথম যে বিপত্তি দেখা দেয় সেটা বেশ গুরুতর। বুঝতেই পাড়ছো, ফিলে যখন দুলতে দুলতে গিয়ে ধুমকেতুর বুকে নেমে আসবে তখন তার গা থেকে ধাক্কা খেয়ে তিড়িং করে ফের খানিক উঠে যেতে পারে। তা হলেই তো সব পণ্ড। সেখানে বাতাসটাতাস নেই। ধুমকেতুর অভিকর্ষও কম। ফলে একবার অমনটা হলে হয়ত ফের মহাকাশেই ভেসে চলে যাবে ফিলে। সেইজন্য তার গায়ে এঁটে দেয়া হয়েছিল মহাকাশ হারপুন। ধুমকেতুর বুকে নামতেই সে সেই হারপুন চালিয়ে তাকে এঁটে দেবে তার গায়ে।
    যতক্ষণ এই আটকানোটা না হয়, ততক্ষণ ফিলের ঘাড়টা চেপে ধুমকেতুর বুকে ধরে রাখবার জন্য একখানা ছোট্ট থ্রাস্টার রকেট লাগানো হয়েছিল তার মাথায়। কাজ শুরু করতে গিয়ে দেখা গেল, সেই ছোট্ট থ্রাস্টারটা বিগড়েছে।
    এর জন্য নির্ধারিত সময়ের চেয়ে খানিক দেরি হয়ে গেল কাজটা করতে। পৃথিবীতে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সিতে তখন বেজায় টেনশন। কী হয় , কী হয়।
    রোসেটা থেকে ফিলে বের হয়ে যাবার পর ঘন্টাসাতেক ধরে তা ধীরে ধীরে নেমে আসছিলো ধুমকেতুর বুকে। তখন তার কথা কইবার সময় কোথায়? ফলে তার কোন খবর না পেয়ে এদিকে বিজ্ঞানিরা অস্থির হচ্ছিলেন।


    মাঝখানে শুধু রোসেটা একখানা ছবি পাঠিয়েছিলো, যাতে দেখা যাচ্ছে ফিলে চলেছে ভাসতে ভাসতে। সঙ্গে সে ছবিটা দিলাম।


    অবশেষে গতকাল রাত সাড়ে নটার সময় ফিলে তার প্রথম সংকেত পাঠালো, “আমি নেমে গেছি ধুমকেতুর বুকে।” প্রথম ছবি পাঠালো ধুমকেতুর একটা ক্লোজ আপ।পরে দেখা গেল সম্ভবত নামবার সঙ্গেসঙ্গে তার হারপুনও কাজ করেনি। বিজ্ঞানিরা তাই অনুমান করছেন নামবার পর অন্তত একটা ডিগবাজি খেয়েছে ফিলে ধুমকেতুর মাটিতে। কিন্তু তাতেও যে তার শরীর টরির ঠিকই আছে, তার প্রমাণ হল তার সেই মেসেজ।
    ৬৪ ঘন্টা ধরে কাজ করবে ফিলে-র ব্যাটারি। তারপর ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলে সে ঘুমিয়ে পড়বে তার নতুন বাড়ি ধুমকেতুরই বুকে। কিন্তু ততক্ষণে তার গবেষণার সব ফলাফল সে পাঠিয়ে দিয়েছে বহু লক্ষ মাইল দূরে বসে থাকা তার মানুষ সৃষ্টিকর্তাদের কাছে। অপার রহস্যের ধুমকেতুতেই পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টির রহস্য লুকিয়ে আছে বলে বিজ্ঞানিদের অনেকেরই অনুমান। সে রহস্য হয়ত ফাঁস হবে তার গবেষণায়।


    তারপর? ধুমকেতু ছুটে চলবে সূর্যের দিকে, তাকে ঘিরে উড়ে চলবে অতিকায় সেই মহাকাশ ফড়িং, মানুষ যার নাম রেখেছে রোসেটা, সে ক্রমাগত পৃথিবীতে জানিয়ে চলবে ধুমকেতুর খবরাখবর। আর তার বুকে ঘুমিয়ে থাকবে ছোট্ট এক রোবট গবেষণাগার, যে আর কখনো জাগবে না।
    তারপর একদিন, সেই ফড়িঙ আর সেই রোবটযানকে সঙ্গে নিয়ে ধুমকেতু মিলিয়ে যাবে সৌরজগতের একেবারে শেষ সীমায়। সেখানে উর্ট ক্লাউড নামে গভীর মহাজাগতিক মেঘ ঘিরে থাকে আমাদের সৌরপরিবারকে। সেই হল রাবার ডাকি-র জন্মভূমি। কিন্তু, কী রহস্য লুকিয়ে আছে সেইখানে সে খবর দেখেশুনে পৃথিবীকে পাঠাবার জন্য তখন আর জেগে থাকবে না রোসেটা বা ফিলে।