২৫ এপ্রিল ২০১৬

খবরকাগজ
  • আজকের তারিখটা বিজ্ঞান এবং মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে খুব গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫৩ সালে আজকের ২৫ এপ্রিল তারিখে নেচার ম্যাগাজিনে একটা আর্টিকল বেরিয়েছিল যা সভ্যতার ইতিহাসকে নতুন দিশা দেখিয়েছিল। জীবকোষের সুপারকমপিউটার ডি এন এর রহস্যকে উদ্ধার করে সেই গবেষণাপত্রটা, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বা জিনপ্রযুক্তির অত্যাধুনিক দুনিয়ায় ঢোকবার চাবিকাঠি তুলে দিয়েহিল মানুষের হাতে। ব্যাপারটা ভেঙে বলা যাক।
    আমাদের সব শারীরিক বৈশিষ্ট্যের স্মৃতিগুলোকে জন্মজন্মান্তরে বাবামায়ের থেকে সন্তানের মধ্যে বয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজটা করে কোষের মধ্যে বসে থাকা এক সুপার কমপিউটার। তার নাম ডি এন এ।
    ১৯৫৩ সালের সেই গবেষণাপত্রে ফ্রান্সিস ক্রিক আর জেমস ওয়াটসন নামে দুজন বিজ্ঞানি মানুষকে জানিয়েছিলেন, ঠিক কীরকম চেহারা হয় সেই ডি এন এ-র আর কীভাবেই বা তার মধ্যে রাসায়নিক স্মৃতিকোষগুলো সাজানো থাকে। সে আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গিয়েছিল মানুষের সভ্যতার নতুন অধ্যায়, যে অধ্যায়ে মানুষ এই সুপারকমপিউটারদের চিনে নিয়ে দরকারে তাদের প্রোগ্রামিং এ অদলবদল করে জীবন্ত বস্তুদের চরিত্রে কল্যানকারী বদল আনতে পারবে। শুরু হবে বিশ শতকের সবচেয়ে চমকপ্রদ বিজ্ঞান অভিযানগুলোর অন্যতম অভিযান—জেনেটিক প্রোগ্রামিং।
    তবে ক্রিক আর ওয়াটসন যে কাজটা করেছিলেন তা কিন্তু তাঁরা একলা একলা করেননি। তাঁদের পূর্বসূরী বিজ্ঞানিরা ধাপে ধাপে যে গবেষণাগুলো করেছেন তার থেকে পাওয়া তথ্যদের একত্র করে বিশ্লেষণ করে পেশাদার গোয়েন্দার মতই নিজেদের অসামান্য সিদ্ধান্তটাতে পৌঁছেছিলেন তাঁরা। সে এক রোমাঞ্চকর ডিডাকশান ও ডিটেকশানের গল্প। কোথায় লাগে শার্লক হোমস তার পাশে?
    আজকের দিনটা এস আমরা সেই গোয়েন্দাগিরির ধাপগুলোর গল্প শুনি।

    প্রথম পদক্ষেপ—মেইশেরের আবিষ্কার

    গল্পের শুরু হচ্ছে ১৮৬৯ সালে। সে বছর মেইশের নামের এক সুইস বিজ্ঞানি শহরের হাসপাতালের কাছে রোগিদের পুঁজ মাখা ব্যান্ডেজ চেয়ে পাঠিয়েছিলেন কয়েকটা।পুঁজের প্রধান উপাদান এ মৃত শ্বেতকণিকা সে তো তোমরা জানো। মেইশেরের উদ্দেশ্য ছিল ব্যান্ডেজগুলোকে ধুয়ে তার থেকে শ্বেতকণিকা বা লিউকোসাইটগুলোকে আলাদা করে নিয়ে ওর মধ্যে কী কী ধরণের প্রোটিন থাকে সেগুলোকে খুঁজে বের করা। কাজটা করতে গিয়ে কোষগুলোর নিউক্লিয়াসের ভেতরে মেইশের একটা রহস্যময় জিনিসের খোঁজ পেলেন। সাধারণত শরীরের কোষগুলোতে যেসব প্রোটিনের খোঁজ মেলে তাদের থেকে তার চরিত্র অনেকটা আলাদা। এক নম্বর হল, তাদের মধ্যে অনেক বেশি পরিমাণে ফসফরাস থাকে, আর দু নম্বর বৈশিষ্ট্যটা হল, হজমের উৎসেচক এদের হজম করতে পারে না।
    অভিজ্ঞ মেইশের বুঝলেন নতুন কিছু একটা রহস্যময় জিনিস আবিষ্কার করেছেন তিনি। জিনিসগুলোর নাম তিনি রাখলেন নিউক্লিন। ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, ঠিক করে খুঁজলে কোষের নিউক্লিয়াসের ভেতর এ জাতীয় অনেক নিউক্লিনের সন্ধান মিলবে।

    গবেষণাটা সে সময় বিশেষ গুরুত্ব পায়নি। সে সময়ের বিজ্ঞান এ আবিষ্কারকে বুঝে উঠে তাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য তৈরি ছিল না। মেইশারের আবিষ্কার তাই চাপা পড়ে রইল বিজ্ঞানের অর্কাইভের তাকে, বিমৃতির ধুলো মেখে। অপেক্ষায় রইল উন্নততর এক সময়ের।

    দ্বিতীয় পদক্ষেপ-লেভেন এর আবিষ্কার

    কেটে গেল অর্ধেক শতাব্দি। ১৯১৯ সালে একটা নতুন গবেষণাপত্র এল বিজ্ঞানিদের সামনে। লেখক, রাশিয়ান বিজ্ঞানি ফোবাস লেভেন। লেভেন বিরাট বিজ্ঞানি ছিলেন। ৭০০র ওপর গবেষণাপত্র ছিল তাঁর জৈব অণুদের স্বভাবচরিত্র নিয়ে।
    ইস্ট নামে ছত্রাকের কোষের নিউক্লিন (তখন তার নাম হয়েছে নিউক্লিক অ্যাসিড) অণুদের হাইড্রোলিসিস পদ্ধতিতে ভেঙে বছরের পর বছর ধরে তার চরিত্র অনুধাবন করেছিলেন লেভেন। এই গবেষণার ফল হল তাঁর ১৯১৯ সালের গবেষণাপত্র। সেখানে তিনি প্রমাণ দেখালেন যে, কোষের নিউক্লিয়াসের মধ্যে যে নিউক্লিক অ্যাসিড নামের ফসফরাস সমৃদ্ধ বস্তুটার খোঁজ পেয়েছিলেন মেইশার, সেটা তৈরি হয় অনেকগুলো ক্ষুদ্রতর কণা দিয়ে। তাদের নাম দিলেন নিউক্লিওটাইড।

    প্রতিটা নিউক্লিওটাইডে থাকে চার রকমের নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ উপাদানের মধ্যে যে কোন একটা, একটা চিনির অণু আর একটা ফসফেট কণা।এই চার রকমের নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ উপাদানের নাম যথাক্রমে অ্যাডিনিন্, গুয়ানিন, থাইমিন ও সাইটোসিন (সংক্ষেপে অ, গ, থ, স । এখন থেকে এই নামের আমরা ডাকব এদের।)

    কেমনভাবে সাজানো থাকে এই চার প্রোটিন? লেভেন বললেন তারা সাজানো থাকে সবসময় অ-গ-স-থ-অ-গ-স-থ এই ভাবে।

    লেভেনের দেখানো পথে এইবার দুনিয়া জুড়ে শুরু হয়ে গেল নানাধরণের জীবকোষ নিয়ে তাদের নিউক্লিওটাইডের গঠনকে খুঁটিয়ে দেখবার কাজ। তাইতে দেখা গেল, নিউক্লিওটাইডের যে চিনির অণুটা থাকে সেটা দু রকমের হয়। একদল হল রাইবোজ(যে নিউক্লিক অ্যাসিডে এগুলো থাকে তাদের নাম দেয়া হল আর এন এ বা রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড) অন্যদল হল ডি-অক্সিরাইবোজ( এদের নাম দেয়া হল ডি এন এ বা ডিঅক্সি রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড।)

    আরো জানা গেল অ আর গ নামের নাইট্রোজেনসমৃদ্ধ কণাগুলোকে দেখতে একসঙ্গে জোড়া দুখানা আংটির মতন, বা ইংরিজি এইট সংখ্যাটার মতন(এদের একসঙ্গে নাম দেয়া হল পিউরিন) আর স আর থ হল একটা একক আংটির মতন। (এদের একসঙ্গে বলা হল পিরিমিডিন। ইতিমধ্যে অ, গ, স, থ র সঙ্গে আরো একটা নাইট্রজেনসমৃদ্ধ কণার খোঁজ মিলেছে। তার নাম ইউরাসিল বা সংক্ষেপে ইউ। দেখা গেছে এটিও একধরণের পিরিমিডিন বা এক আংটির যৌগ।

    বিজ্ঞানিরা এ-ও দেখালেন যে
    আর এন এ তে থাকে অ, গ, স, ইউ
    আর ডি এন এ তে থাকে অ,গ,স,থ।
    তার মানে লেভেন যাদের দেখেছিলেন তারা ছিল ডি এন এ।
    কী কাজে লাগে এই ডি এন এ রা? কেন তাদের গুরুত্ব দেব আমরা? প্রকৃতি খুব হিসেবি। বেখেয়ালে কোন কাজ করেন না তিনি। কোষের ভেতর ওরা যখন আছে তখন নিশ্চয় কিছু দরকারি কাজ করে ওরা। কী সেটা?


    জিনদেবতা

    এই দিকটা নিয়ে কিছু মানুষ কাজ করে চলেছিলেন বহুদিন ধরে। শেষে ১৯৪৪ সালে রকেফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ের অসওয়াল্ড অ্যাভেরি আর তাঁর সহগবষকরা মিলে একটা নতুন গবেষণাপত্রে প্রমাণ করলেন, এই ডি এন এ দিয়েই তৈরি হয় বংশগতির ধারক ও বাহক জৈব সুপারকমপিউটার জিন।
    বহুকাল আগে এক অস্ট্রিয়ান যাজক মটরগাছ নিয়ে একটা পরীক্ষা করে সিদ্ধান্তে এসেছিলেন, বাপমায়ের শারীরিক বৈশিষ্ট্য সন্তানসন্ততির মধ্যে প্রবাহিত হওয়াটাই প্রকৃতির নিয়ম। জেনেটিকস বা বংশগতিবিদ্যার জনক বলা হয় তাঁকে।


    চার্গাফ সীমা

    সেই অস্ট্রিয়াদেশেরই আর এক বিজ্ঞানি চার্গাফকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল অ্যাভেরিদের আবিষ্কার। বোঝা যাচ্ছিল, ডি এন এ দের চরিত্রকে ঠিকঠাক ধরতে পারলেই, বংশগতির বাহক ও জীবের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের দৃশ্য নিয়ন্ত্রক জিনদেবতার নিয়ন্ত্রণ এসে যাবে মানুষের হাতে। অতএব চার্গাফ এইবার সর্বশক্তি নিয়ে নামলেন সেই কাজে।

    ১৯৫০ সালে একটা গবেষণাপত্রে লেভেনের আবিষ্কারের প্রধান ত্রুটিটা ধরিয়ে দিলেন তিনি। দেখিয়ে দিলেন, ডি এন এর মধ্যেকার নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ কণারা মোটেই সবসময় অ-গ-স-থ এই সজ্জায় থাকে না। এক এক জাতীয় প্রাণীর ক্ষেত্রে তাদের সজ্জায় বেজায় বদল লক্ষ করা যায়। অর্থাৎ এই সজ্জা বিভিন্ন ধরণের কোষের চেহারা নিয়ন্ত্রণের একটা স্মৃতিযন্ত্র।

    এর পাশাপাশি রো একটা দরকারি জিনিস লক্ষ করলেন চার্গাফ। সেটা হল, যেকোন জীবের যেকোন ধরনের কোষেই যতটা ‘অ’ থাকে, ততটাই ‘থ থাকে আর অন্যদিকে যতটা ‘গ থাকে ঠিক ততটা ‘স’ থাকে। তার মানে যেকোন কোষের যেকোন ডি এন এর ক্ষেত্রে একটা জিনিস ধ্রুব—‘অ আর গ’ (মানে পিউরিন)এর মোট পরিমাণ সবসময় ‘স আর থ’ (মানে মোট পিরিমিডিন) এর মোট পরিমাণ সবসময় এক হয়। বিজ্ঞানিরা এ নিয়মের নাম দিলেন চার্গাফ সীমা।
    চার্গাফ এ আবিষ্কারের সময় নিজেও তার গুরুত্বকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেননি। বুঝতে পারেননি এইটাই ক্রিক আ ওয়াটসনের হাতে তুলে দেবে ডি এন এর চেহারার সঠিক মডেল তৈরির চাবিকাঠি।


    তাহলে কী কী পাওয়া গেল?


    ১। নিউক্লিয়াসের মধ্যে থাকে নিউক্লিক অ্যাসিড।
    ২। তার প্রধান উপাদান হল ডি এন এ।
    ৩। ডি এন এ দিয়ে তৈরি হয় বংশগতির ধারক জিন।
    ৩। এই ডি এন এতে চার রকমের নাইট্রোজেনসমৃদ্ধ কণা থাকে। এদের মধ্যে দুজন (অ আর গ) হল পিউরিন আর অন্যদুজন (স আর থ) হল পিরিমিডিন।
    ৪। এই কণাদের সজ্জার ওপর একটা কোষের বৈশিষ্ট্য নির্ভর করে, বা সজ্জাটাই হল বংশগতির সুপারকমপিউটার জিন এর হার্ড ডিস্ক আর প্রসেসর।
    ৫। যেকোন কোষের ডি এন এ তে এবং অ্যাডিনিন আর থাইমিন থাকে একই সংখ্যায় ও গুয়ানিন ও সাইটোসিন থাকে একই সংখ্যায় ও ফলত মোট পিউরিন আর মোট পিরিমিডিন এর সংখ্যা সর্বদা সমান হয়।


    রোসালিন্ড আর মরিসের আশ্চর্য ছবি- রহস্যময়ের ইশারা


    ইতিমধ্যে রোসালিন্ড ফ্র্যাংকলিন আর মরিস উইলকিনস নামের দুই বৃটিশ গবেষক এক্‌স্‌ রে ক্রিস্টালোগ্রাফি নামের এক পদ্ধতিতে আরো কিছু তথ্য জুগিয়েছেন ডি এন এর সম্ভবায় চেহারার বিষয়ে।

    ডি এন এ-র কোথায় প্রোটিনকণারা বেশি ঘন আর কোথায় তা কম আছে সেইটে বোঝবার জন্য তাঁরা এক কায়দা করেছিলেন। তাঁরা ডি এন এ অণুদের স্ফটিক বানালেন প্রথম। এবারে তার মধ্যে দিয়ে এক্স রে পাঠানো হল। ঘনত্বের জায়গাগুলো বেশি আর কম ঘনত্বের জায়গাগুলোয় কম বেঁকে সেই রশ্মিরা ফটোফিল্‌মের গায়ে তৈরি করল নকশা। দেখা গেল সে নকশায় ঘনত্বের জায়গাগুলো একটা এক্স চিহ্নের মতন অবস্থানে আছে। এইটে কেবল তখনই সম্ভব যখন স্ক্রুর মতন পাক খাওয়া পথে সজ্জাটা ঘটে। ভাঁজের জায়গাগুলোয় দুটো অংশ কাছাকাছি থাকায় ওতে ঘনত্ব বেশি ঠেকে।

    অন্যদিকে আমেরিকান গবেষক লিনাস পলিং তখন মেপে বের করছেন কণাগুলোর একে অন্যের সঙ্গে জুড়ে থাকবার কৌণিক মাপজোক আর তাদের অধ্যেকার দূরত্বের হিসেবনিকেশ।সেইসঙ্গে এ-ও জানা গেছে, ডি এন এ-র ওই চার নাইট্রোজেনসমৃদ্ধ কণারা নিজেদের আটকে রাখে চিনি আর ফসফেটের তৈরি দেয়ালের গায়ে।


    দুই ক্ষ্যাপা বিজ্ঞানি, কিছু কাগজ, কাঁচি ও আঠা


    এইসব তথ্যকে হাতিয়ার করে এবারে কার্ডবোর্ড, আঠা আর কাঁচি নিয়ে ক্রিক আর ওয়াটসন বসলেন এই সূত্রগুলোকে মেনে ডি এন এর আদত চেহারাটা কেমন হতে পারে সেইটে তৈরি করতে।
    উদ্দেশ্য ডি এন এর একটা তিনমাত্রার মডেল গড়া।

    ফসফেট আর নাইট্রোজেনের পাক খেয়ে ওঠা রেলিং বানিয়ে তার গায়ে নানাভাবে তাঁরা সাজিয়ে দেখেন নাইট্রোজেন বেস এর চার কণাদের। রেলিং এর ওপরে বেসগুলোর অবস্থান মিলিয়ে এমন একটা সজ্জা তৈরি করতে হবে যা মিলে যাবে ফ্র্যাংকলিন মরিস আর পলিং-দের বলা নানান মাপজোকের সঙ্গে।
    চার্গাফের সূত্র মানলে অ,স,থ,গ র মধ্যে অ আর থ এর সংখ্যা সমান আর স ও গ এর সংখ্যা সমান হবে। তাই এ মডেলে এই বেসগুলোকে বানাতে হবে মইয়ের ধাপের মত। যার একেকটা ধাপ তৈরি হয় অ,থ জুটি দিয়ে বা স,গ জুটি দিয়ে। কিন্তু সমস্যাটা হল, ধাপগুলোর তো চিনি ও ফসফেটের রেলিং-এর গায়ে এঁটে থাকবার কথা। আগের বিজ্ঞানিদের পরীক্ষায় তাই দেখিয়েছে।কিন্তু কার্ডবোর্ডের মডেলে পাক খেয়ে ওঠা একটা রেলিঙের গায়ে সিঁড়ির ধাপ বসানো সম্ভব নয়।বসালে তা এরকম দেখতে হতে হবে। এখানে খেয়াল করলে দেখবে বেস জুটিগুলোর অর্ধেকই বাতাসে ঝুলছে। রেলিং পায়নি।


    সমস্যাটার সমাধান করতে ক্রিক আর ওয়াটসন তখন প্রস্তাব করলেন, রেলিং একটা নয়, হবে পরস্পর সমান্তরাল থাকা দুটো পাক খাওয়া রেলিং। তাদের মধ্যে আটোকানো থাকবে একেকটা জোড়প্রোটিনের ধাপ। ঠিক যেন বড়ো বাড়ির গায়ে লাগানো ফায়ার এসকেপের ঘোরানো সিঁড়ি।



    ব্যস ওতেই সমস্যার সমাধান হল এবং জন্ম নিল ডি এন এর বিখ্যাত ডাবল হেলিক্স মডেল। ওয়াটস ও ক্রিকের তৈরি এই কার্ডবোর্ডের ডাবল হেলিক্স মডেল তাঁদের নোবেল এনে দিয়েছিল।
    ওতেই দরজা খুলে দিয়েছিল জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর,কারণ একবার যখন বংশগতির ধারক জিন এর মূল গঠনগত একক ডি এন এর গঠন জানা গেছে, তখন তাকে ল্যাবে বানিয়ে নিতে বিশেষ সমস্যা হবার কথা নয়। আর তা হলেই তা দিয়ে জীবদেহের গঠনের প্রধান বিল্ডিং ব্লক যে প্রোটিন তাকে বানিয়ে ফেলা যাবে।
    ওয়াটসনদের এই যুগান্তকারী মডেলিং এর কয়েক বছরের মধ্যে, ১৯৬১ সালে, ভারতীয় ডঃ হরগোবিন্দ খোরানা এবং তাঁর সঙ্গীরা মিলে নিউক্লিক অ্যাসিড থেকে শুরু করে বানিয়ে ফেলতে পেরেছিলেন প্রথম এক সরল প্রোটিন। সেজন্য নোবেল পুরস্কারও পান তাঁরা। তারপর তো শুধুই এগিয়ে চলা।

    অ্যান্টিভাইরাল??

    সম্প্রতি আরো একটা আকর্ষণীয় আবিষ্কার ঘটেছে এই এলাকায়। ওয়াটসন আর ক্রিক যে ডি এন এ মডেলিং করেছিলেন তার নাম ‘বি’ ডি এন এ। সেটাই সাধারণ জৈব কোষে থাকে। কিছুদিন আগে আরো একধরণের ডি এন এ মিলেছে এগুলো তুলনায় বে৬টে আর চ্যাপ্টা। এরা শুকিয়ে ওঠা ডিএন এ তে মেলে। তবে কিছু কিছু সংক্রমণ বা অন্য অসুখের সময় আহত কোষ আরেকধরণের ডি এন এ জন্ম দেয়। এর নাম ‘জেড ডি এন এ। অতি সম্প্রতি এদের খোঁজ মিলেছে। এরা ক্ষণস্থায়ী হয়। কিছু পরেই স্বাভাবিক ‘বি’ ডি এন এ তে বদলে যায়। কিন্তু নিজেদের চেহারায় যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ ভাইরাস আক্রমণের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিদন্দ্বীতা গড়ে তুলতে সক্ষম এই জেড ডি এন এ। এই খবরটা পাবার পর থেকে ২০০৩ সাল থেকে জেড ডি এন এ নিয়ে গবেষণা ব্যস্ত দুনিয়ার বহু গবেষক।

    এগিয়ে চলবার পথে তাই, ক্রিক আর ওয়াটসনের সেই দুনিয়া কাঁপানো “ডাবল হেলিক্স মডেল” এর আত্মপ্রকাশের দিন হিসেবে আজকের দিনটাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা যাক।