২৪ নভেম্বর ২০১৫

খবরকাগজ
  • একটা ম্যাজিকের গল্প



    “নামবার ইশটিশান আসছে। জলটুকু শেষ করে নাও বাবু,” বলে প্লাস্টিকের জলের বোতলটা ছেলের মুখের কাছে ধরলেন মা। তারপর বোতলটা খালি হলে সেটাকে মুচড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন জানালা গলিয়ে।
    বেচারি প্লাস্টিকের বোতল। দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে পড়ে রইল রেললাইনের ওপরে। তাকে কেউ ভালোবাসে না। সবাই বলে ও খারাপ জিনিস। তবু সবাই তাকে ব্যবহার করে। পথেঘাটে রেলইস্টিশানের চত্বরে ছড়িয়ে পড়ে থাকে তারা। লোকে বলে, নোংরা।
    একজন কিন্তু অন্যরকম ভেবেছে। সে বলেছে জল শেষ হওয়া প্লাস্টিকের বোতলেরা সুন্দর, তারা ভালো কাজ করতে পারে। তারা মানুষের প্রাণও বাঁচাতে পারে।
    এই বলে সে তা হাতেকলমে করেও দেখিয়ে দিয়েছে। চলো তার 'কোট্টায়াম ম্যাজিক' দেখতে যাই কোট্টায়াম অঞ্চলের আলুভা ইশটিশানে।



    ব্যাপারটা প্রথম মাথায় এসেছিল অরুণের। কোচি থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে আলুভা ইশটিশানের হেলথ ইনসপেকটার অরুণ। সেখান দিয়ে অনেক লম্বা রুটের গাড়ি যায়। অনেক লোকজন ওঠেনামে। ছড়িয়ে রেখে যায় জল শেষ হওয়া প্লাস্টিক বোতলের স্তূপ। তার প্ল্যাটফর্মে, লাইনের ওপরে সেসব আবর্জনা ছড়িয়ে থাকতে দেখে একদিন অরুণের মাথায় একটা প্ল্যান এল।
    যত বোতল ট্রেনযাত্রীরা জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে সেগুলো একত্র করে তিনি তাদের সার দিয়ে সাজাতে শুরু করে দিলেন প্ল্যাটফর্মের ফাঁকে ফাঁকে, এদিক ওদিক, নানান নকশায়। বিরাট স্টেশান। সাজাবার জায়গার অভাব নেই। কিন্তু অভাব নেই বোতলেরও। গল্পের শুরুতে বলা সেই মায়ের মতন বিচ্ছিরি মায়েদের অভাব নেই তো দেশে!
    বোতলে রঙ করে সুন্দর করে সাজানো তো হল। এবারে অরুণ তার গায়ে তুলে দিলেন সস্তার চীনেগোলাপের লতা। সস্তার গাছ। সারটার বেশি লাগে না। সহজে ফুলও ফোটে।
    ব্যস। কিছুদিনের মধ্যে ম্যাজিক। ফুলে ফুলে স্টেশন ছেয়েছে। সস্তার বোতলগুলো বেশিদিন টেঁকে না। তাতে অবশ্য অরুণের দলবলের চিন্তা নেই। যতদিন দেশে লোকজন রেললাইনে জলের খলি বোতল ছুঁড়ে ফেলবার অসভ্যতা করবে ততদিন স্টেশান সাজাবার উপকরণের কোন অভাব হবে না তাঁর।
    আরো একটা উপকার করেছে উপেক্ষিত জলের বোতলরা। তাদের ফাঁকে ফাঁকে কাঁটাভরা চীনেগোলাপের ঝাড়ের দেয়াল তুলে তারা রুখে দিয়েছে লোকজনের ঈললাইন পাড়াপাড় করে চলাফেরা করা। কমে গেছে দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনার সংখ্যা। গোলাপের কাঁটার ভয়ে সেখানে লোকজন এখন রেলওয়ে ওভারব্রিজ বেশি ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন।
    অথচ সবই তো সেই দুঃখিনী খালি জলের বোতলের ম্যাজিক, তাই না? চাইলে যেকোন জিনিস দিয়ে—তা সে দামি হোক আর সস্তা, বিচ্ছিরি হোক কি সুন্দর, দারুণ ভালো কাজ করে ফেলা যায়। তার জন্যে টাকাপয়সার দরকার পড়েও না সবসময়। শুধু মাথায় খানিক বুদ্ধি থাকলেই হল। আর চাই ভালো কিছু করে ফেলার ইচ্ছে।