২৯ নভেম্বর ২০১৫

খবরকাগজ




  • দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার একদল বিজ্ঞানি একটা বিচিত্র আবিষ্কার করেছেন। সরাসরি ইলেকট্রিসিটি খেয়ে বেঁচে থাকা জীব আবিষ্কার করে ফেলেছেন তাঁরা সমুদ্রের গভীর তলদেশে।
    তা সেই জীবদের কথা বলবার আগে একটু ইলেকট্রিসিটি খাওয়া বস্তুটাকে বুঝে নেয়া যাক। আসলে সমস্ত জীবের দেহের কাজকর্ম চালানোয় ইলেকট্রিসিটির একটা ভুমিকা আছে। ধরো নার্ভ কোষের যে সংকেত, ধরো চলাফেরার জন্য যে কোষ বা পেশির নড়াচড়া এগুলো শরীর ঘটায় ইলেকট্রিসিটির ব্যবহার করে। এই ইলেকট্রিসিটির স্রোত শরীরের মধ্যে তৈরি হয় বিপাক বা মেটাবলিজম নামের একটা পদ্ধতিতে। আমরা যা খাই তার থেকে শরীর তৈরি করে সরলতম শর্করা গ্লুকোজ। এই গ্লুকোজের অণুতে দরকারের চেয়ে বেশি কিছু সংখ্যায় ইলেকট্রন থাকে। আবার আমরা যখন নিঃশ্বাস নিই তখন তাতে যে অক্সিজেন শরীরে ঢোকে তার অণুদের মধ্যে আবার ইলেকট্রনের জন্য একটা চাহিদা বা ক্ষিদে থাকে সবসময়। শরীরের ভেতরে গ্লুকোজের অতিরিক্ত ইলেকট্রন সবসময় বয়ে যায় অক্সিজেনের অণুতে, তার ফলে শরীরের ভেতরে তৈরি হয় ইলেকট্রনের স্রোত বা শক্তি, আর তাই দিয়ে শরীর নানান কাজকর্ম করে। এইভাবে আমাদের শরীরের শক্তি, বা বলতে পারো গায়ের জোর তৈরি হয়। গ্লুকোজ আর অক্সিজেন এই দুটো জিনিস তাই চেনাজানা সব জীবদেরই বেঁচে থাকবার জন্য দরকার।
    কিন্তু বিজ্ঞানীদের চমকে দিয়েছে সমুদ্রের তলা থেকে তুলে আনা এই জীবাণুরা। সমুদ্রের গভীর তলদেশ খুব বাজে জায়গা। সেখানে হাওয়াবাতাস নেই। জলেও অক্সিজেন বেশি মিশে নেই, গ্লুকোজের উৎস যে খাবারদাবার তা-ও বিশেষ নেই। এইখানে টিকে থাকবার জন্য কিছু জীবাণু তাই করেছে কি, বেঁচে থাকবার শক্তি সরাসরি শুষে নিতে শিখে ফেলেছে গ্লুকোজ আর অক্সিজেন ছাড়াই। তারা সরাসরি ইলেকট্রন খায় চারপাশ থেকে। তারপর উপযুক্ত জায়গা পেলে সে ইলেকট্রন তার শরীর বেয়ে ফের বাইরে বেরিয়ে যায়। এইভাবে তাদের শরীরে তড়িৎপ্রবাহ চলতে থাকে কোন খাবার বা অক্সিজেন ছাড়াই!!!!
    বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের তলার খানিক মাটি এই জীবাণুদের সঙ্গেই তুলে এনে পরীক্ষাগারে সে মাটিতে তার গুঁজে তাতে উচ্চ বিদ্যুৎ চালিয়ে দিতে দেখা গেল ব্যাকটেরিয়াগুলো তারগুলোর কাছে এগিয়ে এসে তার গা থেকে, ছোটো ছোটো শুঁড় দিয়ে চেটে চেটে সেই ইলেকট্রন খেয়ে ফেলছে, আর তারপরেই বিদ্যুতপ্রবাহ খুব কমিয়ে দিলে আবার তারের গায়ে এসে ইলেকট্রন উগড়ে দিয়েছে গায়ের শুঁড়গুলো দিয়ে।
    পৃথিবীর নানান জায়গায় এখন অবধি দশটার কিছু বেশি এই ধরণের আজব জীবের সন্ধান মিলেছে।


    তাদের মধ্যে সবচেয়ে দক্ষ হল জিওব্যাকটার। তার পুরো নাম জিওব্যাকটার মেটালিরিডিউসেন। ম্যাঙ্গানিজ, সিসে এইসব ধাতুর অক্সাইডের থেকে ইলেকট্রন শুষে নিয়ে খেয়ে নেয় সে। তারপর ফের তাকে উগড়ে দেয়। এই গেলা আর উগরণোর ফলে তার শরীরের ভেতরে ইলেকট্রনের ধারা বইতে থাকে। তৈরি করে জীবনদায়ী বিদ্যুতের স্রোত।
    জিওব্যাকটারের এই বিশেষ গুণকে কাজে লাগিয়ে পেরুর একদল বিজ্ঞানি তাঁদের ক্রান্তীয় বর্ষণবনের ভেজা, অন্ধকার, অনুন্নত গ্রামগুলোর জন্য এক আজব ল্যাম্প বানিয়েছেন। তাতে করা হয়কি, একটা পাত্রে খানিক মাটি নিয়ে তার মধ্যে অনেকগুলো কার্বনের সরু সরু ডান্ডা পুঁতে দেয়া হয়। মাটিতে মিশিয়ে দেয়া হয় জিওব্যাকটার। এইবার মাটিতে একটা চারাগাছ লাগিয়ে দেয়া হয়। তাতে গাছটা যেসব জৈব বস্তু তৈরি করে মাটির ভেতরে, তার থেকে জিওব্যাকটাররা ইলেকট্রন চুষে খেয়ে মাটির মধ্যে ছেড়ে দিতে থাকে ক্রমাগত। কার্বনের ডান্ডাগুলো আবার সেই ইলেকট্রনদের টেনে নেয় নিজের শরীরে। ব্যস। মাটির মধ্যে দিয়ে তৈরি হয়ে যায় ইলেকট্রনের স্রোত, বা বিদ্যুতপ্রবাহ। এইবারে তার সঙ্গে একটা ব্যাটারি লাগিয়ে দিলেই সেটা ক্রমাগত চার্জ হতে থাকে আর তাই দিয়ে ঘরে আলো জ্বালানো যায়।



    শুধু আলো জ্বালানোই নয়। ইলেকট্রনখেকো ব্যাকটিরিয়ারা আরো একটা ব্যাপারে আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। আমরা বুঝতে পারছি মহাবিশ্বে অক্সিজেন, খাবার এইসব যেখানে নেই সেসব জায়গাতেও প্রাণের খবর মিলতে পারে। মিলতে পারে এমনকি গভীর মহাকশের গ্যাসের মেঘের মধ্যেও। আর তাহলে, এমন সব কোষ জুড়ে জুড়ে তৈরি সরাসরি ইলেকট্রিসিটি বা আলোখেকো উন্নত জীব থাকাও অসম্ভব বলে মনে হয় কি?
    আর ভাবো দেখি, জেনেটিক টেকনোলজি যেভাবে এগোচ্ছে তাতে আগামিদিনে মানুষের দেহের কোষগুলোর মধ্যে যদি এ ধর্মটা ভরে দেয়া যায় তাহলে কী হবে? নিঃশ্বাস নেবার দরকার নেই, খাবারের দরকার নেই। খিদে জিনিসটা হারিয়ে যাবে পৃথিবীর বুক থেকে। সাগরের গভীরে, মহাকাশের শূন্যতায় ঘুরে বেড়াবে মানুষের দল। নক্ষত্রের আলোর ফোটন থেকে, সমুদ্রের জলের নুন থেকে সরাসরি শুষে নেবে বেঁচে থাকবার শক্তি। ভগবান হয়ে ওঠবার সংকেতটা প্রকৃতি তাহলে কটা জীবাণুর মধ্যে লুকিয়ে রেখেছেন, কী বলো? এখন আমাদের শুধু তা খুঁজে নেবার অপেক্ষা।