১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫

খবরকাগজ

  • মানুষ দু রকমের হয়। খারাপ মানুষ, আর ভালো মানুষ। ভালো মানুষরা আনন্দে থাকে। খারাপরা আনন্দে থাকে না। তাই খারাপরা রাগ করে ভালোদের মারে। তাদের তাড়িয়েও দেয় ঘর থেকে। কিন্তু ভালোদের তো আসলে বেজায় শক্তি, তাই তারা ঠিক আবার বেজায় কষ্টের মধ্যে থেকেও ঠিক ভালো ভালো জিনিস খুঁজে পেয়ে যায়।
    তেমন একটা গল্প শোনাই শোনো। সিরিয়া নামে দেশের কথা তো সবাই জানো। সেখানে অনেক ভালো লোকজন আছে। কিছু ভীষণ খারাপ লোক এসে এখন তাদের ওপর অত্যাচার করছে। তাদের মারছে, ভয় দেখাচ্ছে। ভালো লোকেরা তো আর কাউকে মারতে পারে না। তাই তারা প্রাণ নিয়ে পালাচ্ছে দেশ ছেড়ে। ভীষণ কষ্ট করে অন্য অন্য দেশে গিয়ে আশ্রয় চাইছে। কেউ আশ্রয় দিচ্ছে, কেউ দিচ্ছে না।
    সিরিয়ার পাশে জর্ডন দেশ। তারা অনেক সিরিয়ার মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে। তাদের তারা খাবার দেয়।
    জর্ডনের উত্তর দিকের মরু এলাকায় যখন পনেরো হাজার দুঃখী সিরিয়ান মানুষের দল এসে আজরাক নামের এক ক্যাম্পে আশ্রয় পেল তারা ভেবেছিল, নিজেদের সুন্দর দেশ ছেড়ে এই মরুভূমিতে তারা কেমন করে বাঁচবে? কিন্তু ওই যে বললাম, ভালোমানুষদের আসলে বেজায় শক্তি হয়! তারই বলে তারা কী কী করছে সেই মরুভূমিতে তার গল্প বলি এসোঃ

    পুতুলওয়ালা


    করিম সাহেবের বয়েস পঁয়ষট্টি। দেশে তাঁর বাড়ি তৈরির ব্যাবসা ছিল। ছিলো চাষজমি আর বেশ কয়েকটা দোকান। অনেক ছেলেমেয়ে আর নাতিনাতনি নিয়ে দারুণ সুখের জীবন ছিল একটা।
    একদিন খারাপ লোকেরা বন্দুক নিয়ে এসে করিমকে বলল, তোমার সব টাকাপয়সা ধনদৌলত, ব্যাবসাপত্তর আমাদের দিয়ে দিতে হবে আর আমাদের দাস হয়ে থাকতে হবে তোমাদের সবাইকে।
    করিমসাহেব ভালো মানুষ। তিনি তো আর দুষ্টুদের উলটে মারতে পারবেন না! সে দেশে এখন এমন অবস্থা যে পুলিসটুলিশকে বলে কোন লাভ নেই। করিমসাহেব তাই প্রাণ বাঁচাতে সবকিছু ফেলে রেখে বাড়ির সবাইকে নিয়ে দেশ ছেড়ে পালালেন।
    জর্ডনের মরুভূমিতে এসে উদ্বাস্তুদের জন্য তৈরি খুপরিখুপরি ঘরগুলোতে এতজনকে নিয়ে উঠে নোংরা , আবর্জনায়, গরমে, ভালো খাবারের অভাবে কষ্ট হয়েছিল তাঁর। বাড়ি ফেলে চলে আসবার সময় তাঁর আঙুরক্ষেতে আঙুর পাকতে শুরু করেছিল। চোখের সামনে তাই ভাসত করিমসাহেবের।
    কিন্তু তিনি ভাবলেন, কষ্ট হয় হোক, তবু তাঁর বাড়ির ছোটো ছোটো এতগুলো নাতিনাতনি যেন আনন্দ পেতে পারে ওই ভয়ানক জায়গাতে বসেও।
    কাজেই, সেই মরুভূমিতে বসেই কাজ শুরু করে দিয়েছেন করিমসাহেব। উদ্বাস্তুদের খাবারদাবার, ওষুধপত্র চালান আসে যেসব থার্মোকলে বাক্সে, সেই থার্মোকল, ফেলে দেয়া প্লাস্টিকের টুকরো, পাইপ, মরুভূমির বালি, নুড়িপাথর এইসব হল তাঁর উপকরণ।তাই দিয়ে তিনি প্রথমেই ঘরগুলোর মধ্যে ছোটো ছোটো দেয়াল তুলে অনেকগুলো ছোটোছোটো ঘর গড়ে দিলেন। শোবার ঘর, খেলার ঘর এইরকম। তারপর সূর্যের আলো, জল, পাইপের টুকরো আর মরুভূমির বালিপাথরকে ব্যবহার করে গড়ে ফেললেন আজব রেফ্রিজারেটর, যা জলের বাষ্পীভবনকে কাজে লাগিয়েই খাবার, পানীয়কে ঠান্ডা রাখতে পারে। গরমকালে একগেলাস ঠান্ডা শরবতের মত মজা আর কিছুতে হয় নাকি?
    এতেও শেষ নয়। সবসময় মুখে হাসিটি লেগে থাকা করিমসাহেব এখন থার্মোকল দিয়ে বসতির ছোটোদের জন্য খেলনা গড়বার ওস্তাদ কারিগর। বিশ্বাস না হলে সঙ্গের ছবিটা দেখো!

    ডাক্তার হাসনা

    হাসনার বয়েস ষাট। তিনি একজন তাড়া খেয়ে পালিয়ে আসা সিরিয়ার মানুষ। তিনি খুব পড়াশোনাজানা একজন বিখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানি। জীবনের তেত্রিশটা বছর সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় আর গবেষণাগারে। দক্ষিণ সিরিয়ার ডেরা নামের শহরে তাঁর বাড়ি ছিল। দু বছর আগে তাঁর স্বামী বদলি হয়ে দামাস্কাস শহরে যান। হাসনা রয়ে গেলেন ডেরাতেই। জিনিসপত্তর গুছিয়ে বাঁধাছাদা করে নিয়ে দামাস্কাসে চলে যাবেন দু একমাস বাদে এই ছিল তাঁর ইচ্ছে।
    কিন্তু সে আর হয় নি। এর কদিন বাদেই বন্দুক হাতে খারাপ লোকগুলো দামাস্কাসের রাস্তা দিল বন্ধ করে। কেটে দিল টেলিফোনের তার। তার কিছুদিন পরে যখন তারা এসে ডেরা ঘিরে ফেলল, হাসনা বুঝতে পারলেন আর রক্ষা নেই। কারণ এই খারাপ লোকেরা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় পড়াশোনা করা মেয়েদের। তারি তারা তাদের কষ্ট দিয়ে মেরে ফেলে। তাই তিনি একাএকাই পথে বের হয়ে পড়লেন। সঙ্গে রইল উদ্ভিদবিদ্যার ওপর পনেরোটা বই, আর কিছু ভালো ভালো গাছের বীজ। সেই বীজগুলো তাঁর আশা। আর বইগুলো তাঁর সাধনার মন্ত্র।
    জর্ডনের মরুভূমির সেই ক্যাম্পে এখন তাঁর ঘরটিতে ঢুকলেই পাওয়া যায় নানান ওষধি গাছের মনমাতানো গন্ধ। এত কষ্ট দুঃখ সয়েও হার মানেন নি হাসনা। সঙ্গে আনা জ্ঞান আর ওষধি গাছের বীজের জোরে হয়ে উঠেছেন ক্যাম্পের ডাক্তার। সবার ভালো করছেন সেইখানে বসে। স্বামী বেঁচে আছেন কি না জানেন না হাসনা। সিরিয়া থেকে এক পড়শি কোনমতে তাঁকে তাঁর বাড়ির একটা ছবি পাঠিয়েছিল। বাড়িটাকে গোলা দিয়ে ভেঙে দিয়েছে খারাপ লোকেরা। তার দেয়ালে অজস্র বুলেটের দাগ। শুধু বাগানটা বেঁচে আছে তাঁর। হাসনা কিন্তু কাঁদেন না। প্রাণ ভরে মানুষের সেবা করেন আর আশা করে থাকেন একদিন ফের তিনি ফিরে যাবেন তাঁর বাড়িতে।
    যাবেনই তো! যারা ভীষণ আশা করতে পারে তাদের আশা ঠিক পুরো হয়। এসো আমরাও প্রার্থনা করি সেদিন তাঁর জন্য তাঁর বাগানের গাছেরা যেন ফুল ফোটায়।

    ডায়নামো জিহাদ

    উদ্বাস্তুদের পাড়ায় জিহাদের বাড়ি খুঁজে বের করা সবচেয়ে সহজ। কারণ ওর মাথায় একটা হাওয়াকল আছে। ব্যাপারখানা বলি।
    জিহাদ আর তার বউ জর্ডনের মরু আশ্রয়ে এসে দেখে সেখানে বিদ্যুৎ নেই। থাকার মধ্যে সরকারের দেয়া একখানা সৌরলন্ঠন। যেদিন রোদ থাকে না সেদিন ঘর অন্ধকার। কদ্দিন এমন চলতে বউয়ের মুখঝামটায় অস্থির হয়ে জিহাদ বাইরে এসে আকাশের দিকে মুখ তুলে দেখল। সেদিন রোদ নেই। কিন্তু শনশনিয়ে হাওয়া বইছে। দিনেরাতে সে হাওয়ার খামতি নেই। দেখেই জিহাদের মাথায় আইডিয়া খেলে গেল। কোত্থেকে খুঁজেপেতে সে জোগাড় করে আনল একটা ফেলে দেয়া পুরোনো ডায়নামো। আর জোটালো একটা বেজায় লম্বা ডান্ডা, ফেলে দেয়া টেলিফোনের তার, আর ফেলে দেয়া টিনের টুকরোটাকরা। সব সারিয়েসুরিয়ে জুড়ে নিয়ে তৈরি হল তার হাওয়াকল। বাড়ির মাথায় দিনরাত্তির বনবনিয়ে হাওয়াকল ঘোরে তার। ঘরে আলো জ্বলে, আর হ্যাঁ, তার ঘর থেকে একটা ইলেকট্রিক লাইন গিয়েছে ক্যাম্পের বাথরুমে। সেখানকার মানুষজনের রাতের বেলা বাথরুম ব্যবহার করতে আর কষ্ট নেই।
    জিহাদের এখন খানিক রোজগার বেড়েছে। সে-ও অবশ্য বউয়ের বকুনিতে। ব্যাপ্রখানা এই। মরুভূমিতে অনেক ইঁদুর থাকে। তাদের জ্বালায় ক্যাম্পের বাসিন্দারা অস্থির। শেষে একদিন জিহাদের বউ তাকে হুমকি দিল, হয় এ বাড়িতে ইঁদুর থাকবে, নয় আমি। জিহাদ মুচকি হেসে খানিক ফেলে দেয়া টিনের টুকরো আর তার নিয়ে বসে গেল। খানিক বাদেই তৈরি হল চমৎকার এক ইঁদুর ধরা কল। প্রথম প্রথম ওতে কেউ খেয়াল করে নি। কিন্তু তারপর জিহাদের বউ যখন সাত সাতটা ইঁদুর মরা বাইরে ফেলতে গেল তখন লোকজনের চমক ভাঙল। ইঁদুরের জ্বালায় তারাও অস্থির যে! জিহাদ এখন ক্যাম্পের ইঁদুরকল সাপ্লায়ার হয়েছে। নিজেই বানায়, নিজেই বেচে। লোকজন ধন্যি ধন্যি করে। তার রান্নাঘরে গেলে দেখবে রয়েছে জলের ক্যান আর সরু নল দিয়ে তৈরি বেসিনের কল, ঘরের ভেতর সে যে কার্পেটে চটি পরে ঘোরে তা সে বানিয়েছে পুরোনো কম্বল কেটে। সেই দিয়েই চমৎকার জ্যাকেটও আছে তার। কেমন আছো জিজ্ঞেস করলে হেসে বলে দিব্যি আছি। দুটো হাত আর মাথার ওপর ছাত এই থাকলে কাউকে পরোয়া করিনে আমি।


    তথ্যসূত্রঃ রাষ্ট্রপুঞ্জের উদ্বাস্তু দফতর (UNHCR)