২৪ আগস্ট ২০১৪

খবরকাগজ
  • লক্ষ্মীর গল্প



    বয়স পঞ্চাশ। এক চোখে দেখতে পান না। প্রিয় খাবার ফল। খ্যাতি পেয়েছেন ছবি আঁকিয়ে হিসেবে। ভালো নাম লক্ষ্মী। ডাকনাম ফুলকলি।জাতিতে হাতি।
    ওয়াইল্ডলাইফ এস ও এস নামের সংস্থাটি যখন তার খবর পায় তখন তার ভারী দুর্দশা চলছে।আগ্রায় সারাদিন টুরিস্টদের পিঠে করে ঘোরাবার কঠিন পরিশ্রমের পর খেতে পায় সামান্যই। মার খায় অনেক। তারপর ক্লান্ত ক্ষুধার্ত ফুলকলিকে চার পায়ে লোহার শেকল বেঁধে রেখে তার মালিক ঘরে যায়।


    সব দেখেশুনে একদিন সংস্থার লোকেরা তার মালিকের কাছে গেল। সে গরিব মানুষ। ফুলকলি তার আয়ের একমাত্র রাস্তা।লোকেরা সব শুনে তাকে বলল, ফুলকলিকে সে যদি মুক্তি দেয় তাহলে তাকে সংসার চালাবার মত টাকাপয়সার বন্দোবস্ত তারাই করে দেবে। সে লোক তাতে সায় দিয়েও দিল। কিন্তু মনের ভেতর ভয়টা রয়েই গেল তার। বড়ো বড়ো মানুষদের আমাদের দেশের সাধারণ মানুষেরা বেজায় ভয় পায় আর অবিশ্বাস করে যে।
    পরদিন যখন সেই লোকেরা ফুলকলিকে আনতে গেল, দেখে, হাতি আর তার মালিক দুজনেই গায়েব। খোঁজ পড়ল চারদিকে। শেষে দিনতিনেক বাদে একটা লোকের কাছে খবর পেয়ে গিয়ে তারা দেখে একটা বেজায় গরম আর নোংরা গুদামের মধ্যে ফুলকলিকে বেঁধে লুকিয়ে রেখেছে তার মালিক। লক্ষ্মী মেয়েটা টুঁ শব্দটি করেনি। একা একা দাঁড়িয়ে কাঁদছে।
    সে তখন রোগা কংকালসার।
    সাবধানে তার শেকল খুলে একগোছা আখ ধরা হল সামনে। ফুলকলির তখন এত খিদে পেয়েছে যে অচেনা লোক দেখেও সে লজ্জা, ভয় কিচ্ছু না পেয়ে শুঁড় বাড়িয়ে দিল। আখের লোভ দেখিয়ে তাকে ট্রাকে তুলে রওনা হল লোকেরা। বারো ঘন্টা ট্রাক চালিয়ে ফুলকলিকে আনা হল বিপন্ন প্রাণীদের উদ্ধারকেন্দ্রে।সেখান ে তাকে খেতে দেয়া হল গরম গরম জাউ। পেটপুরে খেয়ে শান্ত হল সে। এতো ভালো খাবার তার গরিব মালিক নিজেই কখনো খায়নি, সে তো দূরস্থান।
    এইবার ডাক্তাররা এলেন তাকে দেখতে। ওষুধপত্র পড়ল। থাকবার ভালো জায়গা হল। তারপর একটা মানুষ তার সংগে বন্ধু করল এসে। সে সবসময় তার সাথে থাকে। তার ভালোমন্দের খেয়াল রাখে।

    ফুলকলির এখন সুখে দিন কাটে। ভালোবাসে ফল খেতে। তার অনেক বন্ধু হয়েছে। তাদের মধ্যে সেরা বান্ধবী হল আরেকজন হাতি। প্রথম যেদিন ভয়ে আর কষ্টে কাঁপতে কাঁপতে সে এসে পৌঁছেছিল তার নতুন বাড়িতে তখন বিজলি নামের এই মেয়েটাই এসে তার শুঁড়ে শুঁড় ঠেকিয়ে পাশে থেকে তাকে সাহস দিয়ে বলেছিল, সব মানুষই দুষ্টু নয়। এরা লোক ভালো।
    ফুলকলির দু নম্বর সেরা বন্ধু হল তার সাথী মাহুতটি। পুকুরে কাদা খেলতে নেমে মানুষবন্ধু যদি আর কারো সাথে কথা বলে, ফুলকলি তাহলে দুষ্টুমি করে তার গায়ে কাদা ছিটিয়ে দিয়ে একচোখে মিটমিটিয়ে হাসে।
    আরো এক মানুষ বন্ধু আছে তার। তাঁর নাম আল্পনা আহুজা। তার পায়ে রঙ মাখিয়ে বড়ো বড়ো কাগজ পেতে দেন তিনি সামনে। ফুলকলি তখন সেই কাগজের গায়ে পা দিয়ে ছবি আঁকে। আল্পনা তার জন্য তাকে অনেক কলা খেতে দেন। ২০১২সালের মার্চে ওয়াইল্ডলাইফ এস ও এস নামে সংস্থার হাতে উদ্ধার হবার পর আজ সে তাদের পরিবারে একজন শিল্পী সদস্য। ২২ আগস্ট শুক্রবার থেকে তার আঁকা ছবির প্রদর্শনী চলছে রাজধানীর আর্ট স্পাইস গ্যালারিতে। এ প্রদর্শনী থেকে ফুলকলির যা রোজগার হবে তার সবটাই ওয়াইল্ডলাইফ এস ও এস বিপন্ন হাতিদের উদ্ধারের কাজে লাগাবে।
    একসময় ভারী কষ্ট করা ফুলকলি আজ এমনি করেই তার অন্য সাথীদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে। কজন মানুষ তা পারে?
    যারা দিল্লিতে আছো পারলে দেখে এসো তার চিত্রপ্রদর্শী। ইনটারনেটে খোঁজ পেয়ে যাবে ঠিকানার।