২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪

খবরকাগজ
  • কামিনী রায় -প্রথম মহিলা স্নাতক

    করিতে পারি না কাজ,
    সদা ভয়, সদা লাজ,
    সংশয়ে সংকল্প সদা টলে,
    পাছে লোকে কিছু বলে।
    আড়ালে আড়ালে থাকি,
    নীরবে আপনা ঢাকি
    সম্মুখ চরণ নাহি চলে,
    পাছে লোকে কিছু বলে। 
    হৃদয়ে বুদবুদ-মত
    উঠে শুভ্র চিন্তা কত
    মিশে যায় হৃদয়ের তলে,
    পাছে লোকে কিছু বলে।
    কাঁদে প্রাণ যবে, আঁখি
    সযতনে শুষ্ক রাখি
    নির্মল নয়নের জলে,
    পাছে লোকে কিছু বলে।
    মহৎ উদ্দেশ্যে যবে
    একসাথে মিলে সবে,
    পারিনা মিলিতে সেই দলে,
    বিধাতা দিয়েছেন প্রাণ,
    থাকি সদা ম্রিয়মান,
    শক্তি মরে ভীতির কবলে,
    পাছে লোকে কিছু বলে। 
    কবিতাটা লিখেছিলেন কামিনী রায়। বলবে,তিনি আবার কে? নাম শুনিনি তো!
    বলি শোন। আজ থেকে ১৩১ বছর আগে, ১৮৮৩ সনে, যখন এ দেশে মেয়েদের সূর্যের আলোটুকু দেখাও বারণ ছিলো, যখন কলকাতা শহরটার অনেক বাড়ির মেয়েরা গঙ্গায় স্নান করতে চাইলে কাপড়ে ঢাকা পালকিতে করে গঙ্গায় নিয়ে গিয়ে পালকিশুদ্ধ গঙ্গায় চুবিয়ে আনা হত, সেই যুগে ইনি বেথুন কলেজ থেকে দেশের প্রথম মহিলা অনার্স গ্রাজুয়েট হন সংস্কৃত ভাষায়।
    জন্ম ১৮৬৪ সালে বাখরগঞ্জের বসন্দা নামের গ্রামে। বাবা চণ্ডীচরণ সেন ভালো লিখতেন। দুই মেয়ে কামিনী আর যামিনীকে পড়াশোনা শিখিয়েছিলেন যত্ন করে। মেয়েরাও বাবার মুখ উজ্জ্বল করেছিল। যামিনী ডাক্তার হলেন। আর কামিনী সংস্কৃত ভাষায় স্নাতক হবার পর শিক্ষকতায় যোগ দিলেন। ১৮৮৯ সালে প্রকাশিত হল প্রথম কবিতার বই আলোছায়া। সাড়া ফেলে দিয়েছিল বইটা। একজন মেয়ে কেমন করে এত পড়াশোনা শিখে এমন একটা বইও লিখে ফেলল? সেই শুরু। তারপর সুদীর্ঘ ৪৬ বছরের কবি ও মেয়েদের মুক্তির সৈনিকের জীবনে বহু অসাধারণ সাহিত্য তৈরি করেছেন তিনি।
    খুব সুন্দর কবিতা লিখতেন কামিনী রায়। সারা জীবনে অনেক কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন। দীপ ও ধূপ, মহাশ্বেতা, পুন্ডরীক--এমনই আরো অনেক। কিন্তু কবিতা লেখার পাশাপাশি যে জন্যে তাঁকে স্মরণ করছি সে কারণটা কিন্তু আরো অনেক বেশি মহত। তিনি সেই সময়ে মেয়েদের যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হচ্ছিল আমাদের সমাজে, তার একজন প্রধান সৈনিক ছিলেন।
    সে সময়টা কেমন ভয়ংকর ছিলো জানো? পণ্ডিতরা বলতো, তোমার মা যদি পড়াশোনা শেখেন তাহলে এমন পাপ হবে যে তাতে তোমার বাবা মরে যাবেন। মেয়েদের ঘরে আটকে রেখে, পড়াশোনা করতে না দিয়ে ছোট্টোবেলা বিয়ে দিয়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতো। তারপর তারা সারা জীবন ধরে অন্ধকার রান্নাঘরে রান্না করত, বাসন মাজত আর ছেলেদের সেবা করত।
    এমনি একটা সময়ে কামিনী রায় সব বাধাকে তুচ্ছ করে পড়াশোনা শিখে পণ্ডিত হলেন আর তারপর মেয়েদের কষ্ট ঘোচাতে কলমকে অস্ত্র বানিয়ে ঘুরিয়ে ধরলেন সমাজের বিচ্ছিরি লোকদের দিকে। কেন মেয়েদের এতো অত্যাচার করে ছেলেরা সেই কথা মেয়েদের বোঝাবার জন্য একবার তিনি জ্ঞানবৃক্ষের ফল নামে একটা লেখা লেখেন। তাতে তিনি যা বললেন সেটা অনেকটা এই --মেয়েদের পড়াশোনা শেখবার রাস্তায় সবচেয়ে বড়ো বাধা হল ছেলেদের ক্ষমতার লোভ। তারা চায়না আমরা পড়াশোনা শিখে মানুষ হই। ওরা আসলে ভয় পায়। যদি আমরা ওদের সমান সমান হয়ে যাই--
    মেয়েদের লেখাপড়া শিখে উন্নতির জন্য লড়াইয়ের পাশাপাশি ১৯২১ সালে কামিনী রায় লড়াইয়ে নামেন তাদের ভোট দেবার অধিকার দেবার জন্য। বঙ্গীয় নারীসমাজ নামে একটা দল গড়ে শুরু হল আন্দোলন। সঙ্গে ছিলেন কুমুদিনী মিত্র, মৃনালিনী সেনরা। চার বছর যুদ্ধ করবার ১৯২৫ সালে এ দেশে মেয়েরা ভোট দেবার অধিকার পায়। যারা এ লেখাটা পড়ছো তাদের মধ্যে যারা আমেরিকায় থাকো তাদের একটা খবর দেবো। তোমরা জানো কি আমেরিকাতে মেয়েরা ভোট দেবার অধিকার পেয়েছিলো এর মাত্রই ৫ বছর আগে ১৯২০ সালে? জানো কি, আমেরিকার সরকার যে আইনে মেয়েদের ভোট দেবার অধিকার দিয়েছে সে আইনটাতে তাদের মেরিল্যান্ড রাজ্য সম্মতি দেয় ১৯৪১ সালে, ভার্জিনিয়া দেয় ১৯৫২ সালে, আলাবামা রাজি হয় ১৯৫৩ সালে, ফ্লোরিডা আর দক্ষিণ ক্যারোলিনা রাজি হয় চাঁদে মানুষ যাবার বছর ১৯৬৯ সালে, জর্জিয়া আর লুইজিয়ানা রাজি হয় ১৯৭১ সালে আর মিসিসিপি রাজ্য তা মেনে নেয় ১৯৮৪ সালে। এই রাজ্যগুলো ওদেশে মেয়েদের ভোট দিতে দিতো দেশের আইনের ভয়ে, নিজেরা তাতে মোটেই রাজি ছিলো না তারা। তোমাদের ক্লাশে ওদেশের বন্ধুরা যদি কখনো বলে যে ভারতে মেয়েদের খুব অসম্মান তাহলে তখন তাদের এই খবরগুলো বলে আমাদের কামিনী রায়ের গল্প বলে দিও তোমরা। দেখবে কেমন অবাক হয়ে যাবে সবাই।
    । ১৯৩৩ সনে আজকের দিনটিতে মারা গিয়েছিলেন তিনি। যে মেয়েরা এই লেখাটা পড়ছো তারা জেনো, তোমাদের এই পড়াশোনা করবার, দেশের রাজা কে হবে সেইটে ঠিক করবার যে অধিকার আজ জন্মগত, সেই অধিকার আদায় করবার জন্য দুনিয়াজোড়া যে লড়াই মেয়েরা করেছেন তাদের মধ্যে একজন প্রধান সেনাপতি ছিলেন আমাদের কামিনী রায়।
    জয়ঢাক তাঁকে প্রণাম জানায়।