কুড়ি ফেব্রুয়ারি ২০১৬

খবরকাগজ
  • গাছের মায়ের পুত্রশোক


    অ মি তা ভ প্রা মা ণি ক

    গাছের যে প্রাণ আছে, তা তো তোমরা জানোই। শতাধিক বছর আগে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে আঘাত করলে গাছেরাও আমাদের মতই ব্যথা পায়। তাঁর উদ্ভাবিত ক্রেস্কোগ্রাফ যন্ত্রে তিনি সেই কম্পনের ছবি এঁকেছিলেন।

    এবার যদি বলি, গাছেরাও আমাদের মত সামাজিক, তাদেরও ফেসবুকের মতো সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং আছে!
    অবাক হয়ো না। ঠিক এই কথাই লিখেছেন জার্মানির ফরেস্ট রেঞ্জার পিটার ভলবেন গতবছর লেখা তাঁর বেস্টসেলার ‘দ্য হিডেন লাইফ অফ ট্রিজ’-এ। গাছেরা শুধুই রোবটের মত তরতর করে ওপরে বেড়ে ওঠে আর ছায়া বা অক্সিজেন দিয়ে আমাদের ধন্য করে না, তারা আমাদেরই মত সমাজ তৈরি করে। তারা গুণতে পারে, শিখতে পারে, মনে রাখতে পারে, অসুস্থ প্রতিবেশীর শুশ্রূষা করতে পারে, এমনকি বিপদ বুঝলে পাশের গাছকে সঙ্কেত পাঠিয়ে সাবধান করে দিতে পারে। আর এই সব তারা করে যার সাহায্যে, তার নামও উড ওয়াইড ওয়েব বা ডব্লিউ ডব্লিউ ডব্লিউ, যা কিনা এক ধরণের ছত্রাক, মাইকোরাইজা।


    জার্মান ভাষায় লেখা বইটা নন-ফিকশন গোত্রে স্পিজেল বেস্টসেলার লিস্টে এক নম্বরে আছে, বিক্রি হয়েছে তিন লক্ষ কুড়ি হাজার কপি। ঊনিশটা দেশে অনুবাদ হিসাবে বিক্রির ব্যবস্থা হচ্ছে।

    ব্যাপারটা কিন্তু সদ্য আবিষ্কৃত নয়। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগেই প্রমাণ হয়ে গেছে মাইকোরাইজা প্রায় নব্বই শতাংশ গাছের শিকড়ে বসবাস করে। মাটি থেকে জল আর অন্যান্য নিউট্রিয়েন্ট তারা শিকড়কে সরবরাহ করে, বিনিময়ে পায় তাদের বেঁচে থাকার রসদ কার্বোহাইড্রেট। ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপিকা প্রফেসর সুজান সিমার্ড সম্প্রতি প্রমাণ করেছেন ঘন জঙ্গলের মধ্যে যে বড় বড় গাছগাছালি, মাটির নীচে তাদের সবার শিকড় এই মাইকোরাইজার মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত এবং মাইকোরাইজার মাইসিলিয়ার মাধ্যমে তাদের মধ্যে এমনকি খাদ্যের আদানপ্রদানও ঘটে।

    ঘন জঙ্গলের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন যে গাছগুলো – মাদার ট্রি – তারাই আশেপাশের অপেক্ষাকৃত নবীন গাছপালার সঙ্গে এই সম্পর্ক স্থাপন করে, যাতে সবাই ঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে। দেখা গেছে কোনো গাছ রোগগ্রস্ত হলে মাদার ট্রির শিকড় মাইকোরাইজার মাধ্যমে রুগ্ন গাছের শিকড়ে সেই রোগের প্রতিষেধক পাঠায়।

    কোনো গাছ মারা গেলে বা কেটে নেওয়া হলে তার শিকড়ে এই খাদ্যচালনা চলতে থাকে বহুকাল। গাছের মা তার পুত্রের মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারে না।