১৫ এপ্রিল ২০১৬

খবরকাগজ

  • অমিতাভ প্রামাণিক


    বিজ্ঞানের একটা গবেষণা কতদিন ধরে চলতে পারে? যতদিন ধরে চালানোর ইচ্ছে!

    গবেষণা বস্তুটা কী? যারা স্কুলে বা কলেজে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাশ করেছ, তারা যা করো, বিজ্ঞানের গবেষণাও তাই। পার্থক্য হচ্ছে, ক্লাশের প্র্যাকটিক্যালে ফলাফল যা হয়, তা জানাই থাকে। গবেষণাতে তা জানা থাকে না। অজানাকে জানাই তো বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য।

    গবেষণার ধাপও সেই তিনটেই – এক্সপেরিমেন্ট অর্থাৎ পরীক্ষা, অবজার্ভেশন বা নিরীক্ষা এবং ইনফারেন্স বা সিদ্ধান্ত। স্কুলের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাশ যদি থাকে এক ঘন্টার, তবে এমন পরীক্ষা করা হয়, যাতে এই তিনটে ধাপই একঘন্টার মধ্যে শেষ করে ফেলা সম্ভব। গবেষকরা বিভিন্ন গবেষণাগারে যা কাজকর্ম করেন, তা কিছু কিছু বেশ কয়েক ঘন্টা বা দিন ধরেও চলে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটা পরীক্ষা চলে বেশ কয়েক মাসব্যাপীও।


    মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক উইলিয়াম বিল একটা পরীক্ষা শুরু করেছিলেন আজ থেকে একশো সাঁইত্রিশ বছর আগে। সেই পরীক্ষা এখনো চলছে। চলবে সম্ভবত আরো চুরাশি বছর ধরে!
    এ যাবৎ যতসব দীর্ঘস্থায়ী গবেষণা পৃথিবীতে হয়েছে, তার দীর্ঘতমগুলোর মধ্যে এটা অন্যতম।

    কী সেই গবেষণা?

    বিল তার গবেষণার জন্যে কুড়িখানা কাচের বোতলে বালি নিয়ে তার মধ্যে একুশটা প্রজাতির প্রতিটার পঞ্চাশটা করে বীজ – অর্থাৎ প্রতি বোতলে এক হাজার পঞ্চাশটা করে বীজ – নিয়ে সেই বোতলগুলো মাটির তলায় কুড়ি ইঞ্চি গভীরে পুঁতে রেখেছেন বোতলের মুখটা নীচের দিকে করে, যাতে বোতলে জল ঢুকে না যেতে পারে। গাছের বীজ, তোমরা জানো, এমনিতে সুপ্ত বা ডরম্যান্ট অবস্থায় থাকে বেশ অনেক দিন, তারপর অনুকূল অবস্থা পেলে মানে অঙ্কুরিত হওয়ার জন্যে যে যে বস্তু দরকার হয় যেমন জল হাওয়া ইত্যাদি, তাতে অঙ্কুরোদ্গম হয়। এই যে বললাম বেশ অনেক দিন, বিলের গবেষণার প্রশ্ন ওটাই – কত দিন?

    কেন এই প্রশ্ন করলেন বিল, কত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রশ্ন? অনেকটাই। তোমরা জানো হয়ত যে শস্য ফলান যে চাষীরা, তাদের এক প্রধান সমস্যা হচ্ছে মাঠের আগাছা। যতই নিংড়ে উপড়ে পুড়িয়ে দেওয়া হোক না কেন, আবার রক্তবীজের মত গজিয়ে যায় তারা। যে সময় এই পরীক্ষা শুরু করেছিলেন বিল, ১৮৭৯ সালে, তখন কৃত্রিম পেস্টিসাইড বা জীবাণুনাশক বস্তুসমূহ আবিষ্কার হয়নি। এই পরীক্ষা করলে জানা যাবে কোন গাছের বীজ সুপ্ত অবস্থায় বেশি বছর টিঁকে থাকে।

    বিলের উদ্দেশ্য ছিল প্রতি পাঁচ বছর পর পর কেউ এসে একটা করে বোতল মাটির তলা থেকে তুলে ঐ এক হাজার পঞ্চাশটা বীজ উপযুক্ত জমিতে চাষ করে পরীক্ষা করে দেখবে কোন প্রজাতির ক’খানা বীজ থেকে চারা বেরোলো। চল্লিশ বছর ধরে এমনই চললো। ততদিনে বিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়ে নিয়েছেন। দেখা গেল বেশ কিছু প্রজাতির বীজ থেকে প্রতিবারই চারা গজাচ্ছে প্রচুর, তাই পাঁচ বছরের বদলে দশ বছর পর পর বোতল মাটির নীচ থেকে বের করার সিদ্ধান্ত নিলেন তারা। সেটা ১৯২০ সাল। ১৯৮০ সাল অবধি তাই চললো। তখনো দেখা গেল একুশটার মধ্যে তিনটে প্রজাতির বীজ থেকে অঙ্কুর বেরোচ্ছে। তাই সময় পালটে এখন করা হয়েছে বিশ বছর পর পর।


    ২০২০ সালে পরবর্তী বোতল তোলা হবে। তখনো মাটির নীচে থাকবে আরো চারখানা বোতল!

    ২০০০ সালে বোতল বের করে পরীক্ষা চালিয়েছিলেন বিজ্ঞানী টেলিউস্কি, দেখলেন ভার্বাস্কাম ব্ল্যাটারিয়া নামে একটা প্রজাতি এই দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে, এর বীজ থেকে অঙ্কুর বেরিয়েছে পঞ্চাশটা বীজের মধ্যে তেইশটার, মাটির নীচে অন্ধকারে বালির মধ্যে একশো একুশ বছর পোঁতা থাকার পরও। এর আগের বের করা প্রত্যেক বোতলে এই প্রজাতির বীজের চারা বেরিয়েছে সবচেয়ে বেশি। মালভা পুসিলা নামে আর একটা প্রজাতির কিছু বীজ থেকে চারা বেরিয়েছে, বাকিরা আর অঙ্কুরোদ্গমে সক্ষম নয়।

    এখন দেখার ২০২০ সালে কী ফল বেরোয়। আর চার বছর পরে বোতল বের করবেন টেলিউস্কিই, এখন থেকেই উনি উত্তেজিত। তবে একমাত্র বাগানের মালি আর উনিই জানেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ঠিক কোথায় পোঁতা আছে এই বোতলগুলো। ওরা চান না কেউ অহেতুক সেখানে খোঁড়াখুঁড়ি করে এই শতাব্দীপ্রাচীন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় জল ঢেলে দেয়।