১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

খবরকাগজ
  • এদের বাঁচতে দাও- অপূর্ব চট্টোপাধ্যায়



    অতি সম্প্রতি ফেসবুকে একটি ছবি দেখে চমকে উঠেছিলাম। উত্তর ভারতের একটি গ্রামের মাঠে একটি লেপার্ড (হিন্দী - তেন্দুয়া) হেঁটে যাচ্ছে, আর তার পিছনে একজন ধুতিপরিহিত গ্রামের মানুষ কুঠার হাতে বাঘকে আঘাত করতে উদ্যত হয়েছে। পাশে অপর একজন কুঠার হাতে ছুটে যাচ্ছে আঘাত করার জন্য। রাজস্থানের বারান গ্রাম নিবাসী মনু কুমাওয়াত আন্তা -র সৌজন্যে ছবিটি দেখতে পেয়েছি আমরা। উনি এই ছবিটি ফেসবুকে পোস্ট করেছেন।
    বাঘ (লেপার্ড সমেত) গৃহপালিত পশুদের ধরে খেয়ে ফেলে। গ্রামের মানুষেরা বাঘ দেখলেই মেরে ফেলার চেষ্টা করে। আপাত দৃষ্টিতে এই ছবির মধ্যে অসাধারণত্ব বা অস্বাভাবিকত্ব কিছু নেই। তবে এই ছবিতে গ্রামের মানুষ দুজন যে ভাবে কুঠার হাতে লেপার্ডকে আঘাত করতে ছুটে যাচ্ছে, এ থেকে মনে হচ্ছে এ যাত্রায় বাঘের নিস্তার নেই। শুধু তাই নয় বোঝা যাচ্ছে এইসব গ্রামবাসীদের বাঘ সম্বন্ধে ভীতি একেবারেই নেই।

    ফেসবুকে এই ছবিটা দেখার সময়েই খবরের কাগজে একটি সংবাদ পড়ে খুবই মর্মাহত হয়েছি। জানুয়ারি মাসের ৩০ তারিখের দি টাইমস অফ ইন্ডিয়া পত্রিকায় একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদটির শিরোনামে বলা হয়েছে উত্তরাখণ্ডের গ্রামের মানুষ মাত্র দু হাজার টাকার জন্য লেপার্ড হত্যা করছে। পউড়ি গাড়োয়াল জেলায় সাতটি লেপার্ডের চামড়াসহ কয়েকজনকে ধরা হয়েছে। ধৃত ব্যক্তিদের কাছ থেকে জানা গেছে সাতটি বাঘের চামড়ার জন্য এরা মাত্র ১৪,০০০ টাকা পেত। পুলিস সাতটি চামড়া বাজেয়াপ্ত করেছে। প্রশাসনের মতে এক একটি লেপার্ডের চামড়ার দামই পাঁচ থেকে আট লক্ষ টাকা। যে চারজনের কাছ থেকে এই চামড়া বাজেয়াপ্ত করা হয় তারা দালালের কাছে চামড়া বিক্রির জন্য কোটদ্বার যাচ্ছিল।
    ভি এস খাতি, চিফ ওয়াইল্ড লাইফ ওয়ার্ডেন সংবাদ মাধ্যমকে জানান, বিশেষ সূত্রে তাঁরা জানতে পারেন যে কয়েকজন লোকের কাছে বেশ কয়েকটি লেপার্ডের চামড়া রয়েছে। তারা এগুলি শীঘ্রই দালালের কাছে হস্তান্তরিত করতে চলেছে। বন দফতরের কয়েকজনকে পাঠানো হয় এদের ধরবার জন্য। তারা এই ব্যক্তিদের ধরতে সমর্থ হয়।

    ডি এফ ও রমেশ চাঁদ সাংবাদিকদের জানান, গ্রামের লোকেদের কাছ থেকে খোঁজ পেয়ে আরও তিন ব্যক্তিকে ধরা হয়েছে যারা সহজেই কিছু টাকা পাবার আশায় বন্যপ্রাণী হত্যা করে। এই তিন জনের নাম যথাক্রমে সুন্দর সিং, দীনেশ সিং এবং রাজন কুমার। সুন্দর সিং -এর বাড়ি পউড়ি গাড়োয়াল জেলার থালিসেইন গ্রামে, দীনেশ সিং পাশের গ্রাম বাঙ্গালীতে থাকে আর ডাংরি গ্রামের বাসিন্দা রাজন কুমার। থালিসেইন গ্রামটি পউড়ি গাড়োয়াল জেলার নটি তহশিলের একটি। এই গ্রামের পাশ দিয়ে পূর্ভি নায়ার নদী বয়ে গেছে। সুন্দর সিং পশুপালক। দীনেশ সিং ছাত্র। আর নিকটবর্তী তহশিলে জমা দেবার জন্য যে সব লোক নিজেরা ফর্ম পূরণ করতে পারে না রাজন কুমার সেই ফর্ম পূরণ করে দিয়ে কিছু রোজগার করে।

    এরা এক এক জন ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে লেপার্ড হত্যা করে। সুন্দর সিং এবং দীনেশ সিং গবাদি পশুর মৃত দেহে বিষ মিশিয়ে রেখে দেয়। এই বিষাক্ত গবাদি পশুর মৃতদেহ খেয়ে লেপার্ডের মৃত্যু ঘটে। অন্য দিকে রাজন কুমার আরও ধূর্ত। সে জমিতে ইলেকট্রিক তার বিছিয়ে রাখে। লেপার্ড সেই তারের সংস্পর্শে এলে ইলেকট্রিক শকে মারা পড়ে। এই ঘটনা থেকে বোঝা যায় সাধারণ গ্রামের মানুষ এমন কি ছাত্ররাও এই জাতীয় অন্যায় কাজে নিজেদের যুক্ত করেছে।

    বন্যপ্রাণী হত্যা আজ নয় বহু দিন ধরেই চলেছে। আগে অনেক লুকিয়ে চুরিয়ে এই কাজ করা হত। আজকাল সাধারণ মানুষ এর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছে সহজে কিছু টাকা রোজগার করার জন্য। মজার কথা এই অন্যায় কাজের জন্য কোন অনুশোচনা নেই এদের।

    লেপার্ডের সঙ্গে চিতাবাঘের অনেক মিল আবার গরমিলও রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের কাছে তফাৎটা বিশেষ চোখে পড়ে না। লেপার্ড মূলত নিশাচর, রাত্রেই বেশি বের হয় খাবারের সন্ধানে। চিতা দিনেই বেশি সক্রিয়। লেপার্ডের চামড়ার উপর কালো কালো কয়েকটি ছাপ গুচ্ছভাবে থাকে। একে রসেট বলে। এই গুচ্ছের মাঝের অংশের রং গাঢ় হলুদ। যা চিতায় দেখা যায় না। চিতার দেহের উপর কালো কালো ছাপ দেখা যায়। তবে আমাদের দেশে মূলত লেপার্ডই দেখা যায়।





    ডি এফ ও রমেশ চাঁদের মতে এক সঙ্গে সাতটি লেপার্ডের চামড়া বন দফতরের হস্তগত হওয়া যেমন একটি বড় ঘটনা অপরদিকে এই ঘটনাটি একটি বিশেষ দিকে আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে সাহায্য করছে। এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে সাত জন ব্যক্তি ধরা পড়েছে এরাই শুধু বন্যপ্রাণী নিধনে যুক্ত। নিশ্চিত ভাবে বলা যায় বন্যপ্রাণী নিধন যজ্ঞে আরও অনেকে যুক্ত হয়ে রয়েছে।

    পউড়ি গাড়োয়াল জেলার বেশ কিছু গ্রামের পাশেই ঘন জঙ্গল। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে জঙ্গল কেটে মনুষ্যবসতি গড়ে উঠছে। সেই সঙ্গে কমছে বন্যপ্রাণীর বাসস্থল। অভাব ঘটছে খাদ্যের। লেপার্ড সহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীরা বাধ্য হয়ে চলে আসছে মনুষ্যবসতিস্থলে। গৃহপালিত পশুরা এদের খাদ্য। মারা পড়ছে তারা। সংঘাত ঘটছে মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর। মানুষ কিছু কিছু ক্ষেত্রে হত্যা করছে বন্যপ্রাণীদের। তবে এই সুযোগটি গ্রহণ করছে কিছু অসৎ লোক। তারা সামান্য অর্থের জন্য অবাধে হত্যা করছে বন্যপ্রাণীদের। গড়ে উঠেছে এই সব অসৎ লোকেদের সঙ্গে বিদেশের লোকের যোগাযোগ। তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্র। লেনদেনের পরিমাণ কোটি কোটি টাকার। এর সঠিক পরিমাণ কত তা কেউ জানে না। দু একটি পরিসংখ্যান দিলেই তা বোঝা যাবে। ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ভারতবর্ষে ২,৮৪৫ লেপার্ড মারা হয়েছে। নেপালে ২০০২ সালের মে মাস থেকে ২০০৮ সালের মে মাসের মধ্যে ২৪৩ টি লেপার্ড মারা গেছে। চিন এবং তিব্বতে ছয় বছরে (জুলাই ১৯৯৯ - সেপ্টেম্বর ২০০৫) মারা গেছে ৭৭৪ টি। ওয়াইল্ড লাইফ প্রোটেকশন সোসাইটির ২০১০ সালের মে মাসের একটি হিসাব মত আমাদের দেশে ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১০ পর্যন্ত অন্তত ৩,১৮৯ লেপার্ড মারা হয়েছে। এই সংখ্যা থেকে সহজেই অনুমান করা যায় আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রে কি বিপুল পরিমাণ টাকার লেনদেন হয়। সুতরাং কত মানুষ এর সঙ্গে যুক্ত সহজেই তা অনুমেয়।

    সাধারণ মানুষের মধ্যে চেতনা আনা ছাড়া বন্যপ্রাণীদের বাঁচানো সম্ভব নয়। দরকার স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের এবং গ্রামের মানুষদের সংরক্ষণ বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া। শুধুমাত্র আইন প্রণয়ন করে বন্যপ্রাণী নিধন বন্ধ করা সম্ভব নয়। আমাদের ভাবতেই হবে পৃথিবীটা শুধু মানুষের জন্য নয়। অন্য সকলের বাঁচার অধিকার আছে। অন্যদের প্রাণ হরণের অধিকার মানুষকে কেউ কখনই দেয়নি।