test

লাইব্রেরি ও পুরোনো সংখ্যা

  • এরি সখি তোহে পূরবী সুনাঊঁ কামবরধনীকে কর সুর সম্পূরণ মেল মিলাঊঁ। বাদী গান্ধার বনাঊঁ, সম্বাদী সপ্তম গাঊঁ অস্ত সময় তুরীয় পহর চতুর সুজন মনকো রিঝাঊঁ।

    পণ্ডিত বিষ্ণুদিগম্বর ভাতখন্ডে'র 'হিন্দুস্হানী সঙ্গীত পদ্ধতি–ক্রমিক পুস্তক মালিকা'র এই একতাল মাধ্যলয় খেয়ালের বান্দিশটি থেকেই পূরবী বা পূর্ব্বী রাগটির একটা মোটামুটি পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। যেমন 'সম্পূরণ মেল মিলাঊঁ' মানে এই রাগটির মেল সম্পূরণ - অর্থাৎ সম্পূর্ণ - মানে সাতটি স্বরই লাগবে। 'বাদী গান্ধার বনাঊঁ' মানে বাদী স্বর-গা (গান্ধার), আর 'সম্বাদী সপ্তম গাঊঁ' মানে সম্বাদী-নি (সপ্তম স্বর – সা প্রথম স্বর বলে), গাইবার সময় 'অস্তসময়' - মানে এটি সন্ধিপ্রকাশ রাগ -দিন ও রাতের সন্ধিকালে গেয়। এ সব তো বোঝা গেল। কিন্তু ওই 'কামবরধনী কে কর সুর' মানেটা কি হল? এরকম কোন ঠাট বা স্কেল তো উত্তর ভারতীয় সঙ্গিতের দশটি ঠাটের মধ্যে নেই!

    এর জন্য আমাদের কর্ণাটকি সঙ্গীত পদ্ধতির দ্বারস্থ হতে হবে। ঐ পদ্ধতিতে 'কামবর্ধনী বা কামবর্ধির্নী' একটি মেল - বা স্কেল বা ঠাট বলা যেতে পারে। সেখানে এই মেলটিতে যে স্বরগুলি ব্যবহার হয় সেগুলি হল-

    আরোহণ - সা রে১ গা৩ মা২ পা ধা১ নি৩ সা

    অবরোহণ - সা নি৩ ধা১ পা মা২ গা৩ রে১ সা

    গেল তো আবার সব গুলিয়ে? বেশ তো সা রে গা মা হচ্ছিল, বড়জোর কোমল রে (ঋ, অথবা র), কোমল গা (জ্ঞ বা গা)ইত্যাদি শোনা আছে কিন্তু এইসব রে১, নি৩ এগুলো আবার কী?

    এবার তাহলে কর্ণাটকি বা দক্ষিণ ভারতীয় সঙ্গীতপদ্ধতি নিয়ে কিছু কথা বলতেই হয়। প্রাচীন ভারতীয় শ্রুতি-নির্ভর স্বরগুলির পরিবর্তে উত্তর ভারতীয় বা হিন্দুস্তানী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে বেশ কয়েক দশক ধরেই পাশ্চাত্য স্কেলের পূর্ণ অনুকরণে সা থেকে নি পর্যন্ত মাত্র ১২টি অনড় স্বর বা শ্রুতিস্হান ব্যবহার করেই সঙ্গীত পরিবেশন করা হচ্ছে। শ্রদ্ধেয় ব্যতিক্রমী শিল্পী অবশ্যই আছেন। কিন্তু রাগসঙ্গীতে একই স্বরের আলাদা আলাদা শ্রুতি (আলাদা আলাদা কম্পাঙ্কের শব্দ) রাগ অনুযায়ী ব্যবহার করারই কথা। যদিও এই আলাদা শ্রুতিগুলোর কম্পাঙ্ক একেবারে অনড় বা অপরিবর্তনীয় ভাবে বেঁধে দেওয়া নেই, কিন্ত তার মানে তো এই নয় যে মারোয়া আর ভৈরবী রাগে হারমোনিয়মের মত স্থির পর্দার যন্ত্র সহযোগে একই কম্পাঙ্কের কোমল রে ব্যবহার করা যাবে। দক্ষিণ ভারতীয় বা কর্ণাটকী পদ্ধতিতে অন্ততঃ স্বরগুলোর ভিন্ন কম্পাঙ্কের অস্তিত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তত্ত্বগতভাবে স্বীকার করা আছে এবং সাধারণতঃ শিল্পীরা চেষ্টা করেন সেই ভিন্নতা বজায় রাখার। এই কারণেই সব রাগের স্বর দক্ষিণ ভারতীয় পদ্ধতিতে ঐরকম রে১, নি২ ইত্যাদি লিখে স্বরের শ্রুতিস্থান বোঝানো হয়। এই প্রসঙ্গে পরে আরও একটু বিস্তারিত বলা যাবে।

    উত্তর-ভারতীয় সঙ্গীতে আজকাল সাধারণতঃ ওসবের বালাই রাখা হচ্ছে না বলে বেশিরভাগ বইপত্রেই দেখা যাবে পূর্ব্বী বা পূরবী ঠাটে (এবং রাগে) এই স্বরগুলো ব্যবহার করা হয় -

    আরোহণ - সা রে গা মা পা ধা নি সা

    অবরোহণ - সা নি ধা পা মা গা রে সা

    এবার এই রাগে আধারিত চেনা কয়েকটা গান শোন -(গানে ক্লিক করলে গানের পাতাটা খুলে যাবে। ব্রাউজারে ব্যাক বাটন টিপলেই ফের এই পাতায় ফিরে আসবে)

    ১) নিভৃত প্রাণের দেবতা - রবীন্দ্রসঙ্গীত - সুবিনয় রায়।

    ২) করুণা সুনো শ্যাম মোরি -পঃ রবিশঙ্করের সুরে মীরা সিনেমায় বাণী জয়রামের গাওয়া।

    ৩) জ্বালাও আকাশ প্রদীপ - সুর - প্রভাস দে, কন্ঠ -মান্না দে।

    ৪) ঊস্তাদ বিসমিল্লা খাঁ - সানাই।

    ৫) কলা রামনাথ - বেহালা।

    ৬ নং লিঙ্ক- ওপরে ভাতখন্ডেজীর ক্রমিক পুস্তক মালিকার যে স্বরলিপিটা দেওয়া হল, সেটা সফ্ট সিন্থ-এ বাজিয়ে দেওয়া হল।

    পরে আবার এই রাগটি নিয়ে কথা হবে। এবার ইরা ল্যান্ডগার্টেন* কে ১৯৮৬ সালে নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিছু কথা দিয়ে শেষ করছি। মূল লেখাটি https://saxonianfolkways.wordpress.com/2013/08/30/a-word-fro m-pandit-nikhil-bannerjee/ - লিঙ্ক-এ আছে।
    --সঙ্গীত দিয়ে একটি মানুষের মূল্যায়ণ করা যায়। তাকে বিচার করা যায় কারণ সঙ্গীত দিয়ে মানুষ নিজেকে প্রকাশ করে। সঙ্গীতের ব্যাপার আমি এই বিশ্বের কারো বা কোনকিছুর সাথেই আপোষ করি না। কেউ আমার সঙ্গীতের কদর করল কি করল না তাতে আমার কিচ্ছু আসে যায় না - না, একেবারেই না। আমি যখনই বাজানো শুরু করি, আমি চেষ্টা করি ভাল, আরও ভাল, সুন্দর, স্বর্গীয় বাজনা বাজাতে। আমি এই বস্তুতান্ত্রিক জগতের সীমানা ছাড়িয়ে চলে যেতে চাই মহাশূণ্যের পথে - সেখানে কোন আপোষের প্রশ্নই নেই। আমি উপলব্ধির পথে যেতে চাই - আমার সঙ্গীত বিনোদনের জন্য নয়। এটা অবশ্য শুরুতে, ওই আলাপের অংশটায়। তবলার সাথে বাজনার পর্বটি অন্য অধ্যায় - সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার - সেখানে চলে আসে অঙ্কের সুক্ষ্মতা। একজন শিল্পীর কর্তব্যই হল শ্রোতার আত্মাকে মহতী সত্যের আভাস দেওয়া - তাদের পার্থিব ক্লেদ থেকে মহাজগতের অনাবিল শুণ্যতার শুদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়া।

    *ইরা ল্যান্ডগার্টেনের সেতারের তালিম বিষ্ণুপুর ঘরাণার পণ্ডিত গোকুল নাগ ও পণ্ডিত মণিলাল নাগের কাছে। ভারতীয় সঙ্গীতর প্রচার ও সংরক্ষণে বিশেষ অবদানর জন্য 'ছন্দায়ন জ্যোৎস্না' পুরষ্কার প্রাপক। ওয়ার্লড মিউজিক ইনস্টিট্যুট, নিউ ইয়র্কের সাথে যুক্ত।